এম আর মাসফি
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৩ ১০:৪২ এএম
বরিশাল শিল্পনগরীর বিদ্যমান সাড়ে ৩৭ একর ভূমি উন্নয়ন করে বেসরকারি খাতে ১০০টি শিল্প ইউনিট স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। তবে প্রকল্পটি দুই বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় বছরেও হয়নি। ইতোমধ্যে চারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। খরচ বাড়ানো হয়েছে ১৯ কোটি টাকা।
সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির চতুর্থবারের মতো মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের এই ধীরগতির বিষয়ে বিসিকের পরিকল্পনা ও গবেষণা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ড. মো. ফরহাদ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, স্থানীয় কিছু সমস্যার কারণে প্রকল্পে দেরি হয়েছে। আর কোনো সমস্যা নেই। আশা করছি এ বছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। আর সময় বাড়ানো লাগবে না।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে প্রস্তাবনায় বলা হয়, বরিশাল শিল্পনগরীর বিদ্যমান ৩৭.৫৯ একর ভূমি উন্নয়ন করে বেসরকারি খাতে ১০০টি এসএমই শিল্প ইউনিট স্থাপন, বিসিক শিল্পনগরী বরিশালের বিদ্যমান অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নতি, জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি করা।
প্রস্তাবনা সূত্রে জানা যায়, ষাটের দশকে ১৩০.৬১ একর আয়তনের জমিতে স্থাপিত বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীটির ৩৭.৫৯ একর অনুন্নত জমি বাদ রেখে অবশিষ্ট অংশ উন্নয়নপূর্বক শিল্পনগরী স্থাপন করা হয়। স্থাপিত শিল্পনগরীতে মোট শিল্প প্লটের সংখ্যা ৩৩৪টি, যার সবগুলো বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসহ এ অঞ্চলে বেশ কিছু মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করার প্রেক্ষিতে বরিশালে শিল্প স্থাপনের জন্য শিল্প উদ্যোক্তারা আগ্রহী হয়েছেন। বরিশালে বিদ্যমান শিল্পনগরীতে বরাদ্দযোগ্য কোনো প্লট না থাকায় আগ্রহী উদ্যোক্তাদের প্লট বরাদ্দ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এ প্রেক্ষিতে আগে অধিগ্রহণকৃত এ শিল্পনগরীর অনুন্নত ৩৭.৫৯ একর ভূমি উন্নয়ন করে ১০০টি শিল্পপার্ক স্থাপন ও শিল্প সহায়ক সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিদ্যমান উন্নত অংশে বিভিন্ন অবকাঠামো যেমন- প্রশাসনিক ভবন, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পুকুরপাড় সংরক্ষণ ইত্যাদি জরুরি ভিত্তিতে মেরামত ও পুনর্নির্মাণের জন্য এ প্রকল্প মোট ৫২ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একনেকে অনুমোদিত হয়।
জানা যায়, পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর অর্থাৎ জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এনইসি সভার সিদ্ধান্তের আলোকে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত করা হয়। প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে ৭১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন দেন। এরপর তৃতীয়বার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এরপরও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় গত একনেক সভায় চতুর্থবারের মতো প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে।
চতুর্থবার মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবনায় কাজের অগ্রগতির বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মোট ১৩টি পূর্তকাজের মধ্যে তিনটি শতভাগ, তিনটি ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অন্য কাজসমূহ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের পূর্তকাজ সুসম্পন্ন করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় অপরিবর্তিত রেখে চতুর্থবারের মতো মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে মেয়াদকাল জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রম, ভূমি উন্নয়ন, আবাসিক ভবন ও অন্যান্য নির্মাণ, পাম্প হাউস নির্মাণ, শিল্পনগরীর বাউন্ডারি ওয়াল ও শিল্পনগরীর মেইন গেট নির্মাণ, পুকুরপাড়ে আরসিসি প্যালাসাইডিং, ডিপ টিউবওয়েল, পানি সরবরাহ লাইন স্থাপন, বিদ্যুৎ লাইন ও সোলার প্যানেল স্থাপন, রাস্তা, ড্রেন, কালভার্ট, ডাম্পিং ইয়ার্ড, অন্যান্য নির্মাণ ইত্যাদি।
প্রকল্পের মেয়াদ চতুর্থবার বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে প্রায় ৪০ একর জমিতে বালু ভরাট করার বিষয় উল্লেখ আছে। বালু ভরাটের কার্যাদেশ ২০১৯ সালের মার্চে দেওয়া হলেও স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া বালু ভরাটের কাজ শেষ না করে অন্য কাজসমূহের টেন্ডার আহ্বান করা সম্ভব ছিল না। এরপর ২০২১ সালের আগস্টে বালু ভরাট কাজ শেষ হলে সেপ্টেম্বরে সব কাজের টেন্ডার ইজিপির মাধ্যমে আহ্বান করা হয়। টেন্ডারের সব প্রক্রিয়া সম্পাদনের পর নির্মাণকাজ শুরু করে কাজ চলাকালীন সময়ে এ অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় নির্মাণস্থলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, এতে পূর্তকাজ শুরু করা বিলম্বিত হয়। প্রকল্পের মোট ১৩টি পূর্তকাজের মধ্যে তিনটি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১০টি কাজের মধ্যে তিনটি কাজের ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং অন্য কাজসমূহ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের বাকি পূর্তকাজ সুসম্পন্ন করার জন্য চতুর্থবারের মতো প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে মেয়াদকাল জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে আইএমইডি তাদের সুপারিশে বলেছে, প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে বাস্তবায়ন মেয়াদকাল এক বছর অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তবে বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে ও প্রকল্পের মেয়াদ আর কোনোক্রমেই বৃদ্ধি করা যাবে না। প্রকল্পের কাজের গুণগত মান বজায় রেখে অবশিষ্ট ভৌত নির্মাণ কার্যসম্পাদন করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে সংস্থার তদারকি জোরদার করতে হবে।
জানা গেছে, ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৪৫ শতাংশ এবং প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ২৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৪১ শতাংশ। তবে বর্তমানে এই অগ্রগতি অনেক বেড়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বরিশাল শিল্পনগরীতে ১০০টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ইউনিট স্থাপন করা সম্ভব হবে। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দেশের দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।