× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এবি ব্যাংকের হিসাবে শুভঙ্করের ফাঁকি!

জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৩ ০৮:৫১ এএম

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৩ ১১:২৭ এএম

এবি ব্যাংকের হিসাবে শুভঙ্করের ফাঁকি!

হিসাবের খাতায় গোঁজামিল দেওয়া সাম্প্রতিককালে আর্থিক খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে যেন ডাল-ভাত হয়ে গেছে। শুভঙ্করের ফাঁকির মতোই ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব অবলীলায় মিলিয়ে ফেলছে ‘অতি বুদ্ধিমান’ কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। আর এক্ষেত্রে সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক। ২০২২ সালের আর্থিক বিবরণীতে ব্যাংকটি ২ হাজার ৩১৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করেছে। এই খেলাপি ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ প্রভিশন রাখার কথা ছিল, তা না রেখেই লাভ দেখিয়েছে এবি ব্যাংক। শুধু তা-ই নয়, এর বিপরীতে বোনাস লভ্যাংশও বিতরণ করেছে তারা, যা ধরা পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে। বিষয়টিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

তথ্য বলছে, বছর শেষে (২০২২) বাংলাদেশ ব্যাংকে ৩ হাজার ৯৯৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা খেলাপি ঋণের তথ্য পাঠায় এবি ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ধরা পড়ে যে, ব্যাংকটির প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ২ হাজার ৩১৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের তথ্য চেপে গেছে ব্যাংকটি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জাকির হোসেন বলেন, যদি কোনো ব্যাংক খেলাপীকরণের তথ্য গোপন করে থাকে, তাহলে অবশ্যই এর তদন্ত হবে। প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য বের করে ওই ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। যেসব কর্মকর্তা এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজালের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে এই প্রতিবেদককে জানিয়ে দেওয়া হয়Ñ ‌‘স্যার অফিসে নেই’। কখন তিনি আসবেন তা জানতে চাইলে উত্তর আসে সে বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। এ অবস্থায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি কোনো ফোন কল রিসিভ করেননি। এরপর একাধিক মাধ্যমে এসএমএস পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি তারিক আফজাল। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ সুবিধা (ডেফারেল) নিয়ে লোকসান আড়াল করে আসছে এবি ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংককে সব ধরনের ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করলে বিপুল লোকসানী ব্যাংকে পরিণত হতো এবি ব্যাংক। তথ্য বলছে, প্রভিশন সংরক্ষণে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় পেয়েছে ব্যাংকটি। ডেফারেলের এই বিশেষ কৌশল ব্যবহার না করলে বর্তমানে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। ব্যাংক যদি প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাংকের ওপর। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় আমানত। খেলাপির তথ্য গোপন করা একটি গুরুতর অপরাধ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে পরিচালন মুনাফার দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত, নিম্নমানের শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ এবং সন্দেহজনক শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ প্রভিশন হিসেবে আলাদা করে রাখে ব্যাংকগুলো। মন্দ ও ক্ষতিকর শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংককে ১০০ শতাংশ অর্থ প্রভিশন হিসেবে আলাদা করে রাখতে হয়।

তথ্যমতে, ২০২১ সালে এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ১১০ কোটি। এর বিপরীতে ৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নেয় তারা। ২০২০ সালে ৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার বিপরীতে তাদেরকে ডেফারেল সুবিধা দেওয়া হয়েছিল ৪ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের হিসাবে দেখা যায়, এবি ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৪ হাজার ৬০৪ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা নিয়েছে। ২০১৮ সালে ৭ হাজার ৯৭২ কোটি টাকার বিপরীতে ৬ হাজার ১৭১ কোটি টাকার ডেফারেল সুবিধা পায় তারা। তার আগে ২০১৭ সালে কোনো ডেফারেল সুবিধা ছিল না এবি ব্যাংকের। সে সময় প্রয়োজনীয় প্রভিশনের চেয়ে বেশি সংরক্ষণ করেছিল ব্যাংকটি। ২০১৭ সালে ১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা ছিল ১৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর তারা সংরক্ষণ করেছিল ২৫ কোটি টাকা। একই অবস্থা ছিল ২০১৬ সালেও। ১ হাজার ১২৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজন ছিল ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রভিশন। কিন্তু ভবিষ্যত ঋণ সুরক্ষার জন্য ওই সময় ২৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রভিশন রেখেছিল ব্যাংকটি।

একই পরিস্থিতি দেখা গেছে এবি ব্যাংকের কর-পরবর্তী মুনাফাতেও। একসময় বিপুল মুনাফা করা ব্যাংকটির মুনাফা বর্তমানে নেমে এসেছে অর্ধেকে। ২০২২ সালে তাদের কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ৭১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০২১ সালে ছিল ৭১ কোটি ৬০ লাখ, ২০২০ সালে ৩৯ কোটি ৪০ লাখ, ২০১৯ সালে ১২ কোটি ৩০ লাখ, ২০১৮ সালে ৪ কোটি ৩০ লাখ, ২০১৭ সালে ৪ কোটি, ২০১৬ সালে ১৫০ কোটি ৮০ লাখ এবং ২০১৫ সালে ১৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। উল্লিখিত বছরগুলোতে তাদের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে যথাক্রমে ৮৩ পয়সা, ৮৩ পয়সা, ৫০ পয়সা, ১৫ পয়সা, ০৬ পয়সা, ০৫ পয়সা, ২ টাকা ২৫ পয়সা (২০১৬) এবং ২০১৫ সালে ২ টাকা ১৫ পয়সা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যমতে, এবি ব্যাংক এখন বি-ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। ২০২২ সালে ২ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ব্যাংকটি। শুধু ২০২২ সাল নয়, ২০১৯ সাল থেকেই ব্যাংকটি বি-ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। এই সময়ের মধ্যে কোনো বছরেই ৫ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারেনি তারা। ২০২১ সালে ৩ শতাংশ বোনাস এবং ২ শতাংশ নগদ, ২০২০ সালে ৫ শতাংশ বোনাস এবং ২০১৯ সালে ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে তারা। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারায় জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান ছিল এবি ব্যাংকের। কিন্তু এর আগে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে এ-ক্যাটাগরির ব্যাংক ছিল এটি। ওই দুই বছরে সাড়ে ১২ শতাংশ করে বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল এবি ব্যাংক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা