প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৩ ১৮:১২ পিএম
আপডেট : ২৭ জুন ২০২৩ ১৮:৫০ পিএম
প্রবা ফটো
সকল পণ্য কায়িক পরীক্ষা করলেই শুল্ক ফাঁকির সমস্যা সমাধান হবে বলে মনে করছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি মনে করে, বন্দরে পণ্যের চালানে মিথ্যা ঘোষণার বিষয়টি শুধু শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, বরং বিভিন্ন দপ্তরের নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকা, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের আইনসংক্রান্ত বিষয়, অন্য স্টেকহোল্ডারদের উদ্দেশ্যসহ আরও অনেক আন্তঃসম্পর্কিত বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
অন্য সব দেশের মতো রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ভিত্তিতে পণ্যের চালান খালাসের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা সমীচীন বলে মনে করে রাজস্ব বোর্ড। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের পাঠানো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ অন্যান্য সমুদ্র ও নদীবন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে মালামাল খালাস এবং শুল্ক ফাঁকিসংক্রান্ত দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়ে সুপারিশের জবাবে এ কথা জানায় এনবিআর।
চিঠিতে জানানো হয়েছে, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত গড়ে প্রায় ১৭ হাজার পণ্যচালানের বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে উক্ত বিল অব এন্ট্রির পাঁচ শতাংশ চালানের কায়িক পরীক্ষা করা হলেও প্রতিদিন প্রায় ৮৫০টি পণ্যচালানে কায়িক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। একটি চালানের সকল পণ্য কায়িক পরীক্ষা করতে গড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা থেকে ২-৩ দিন সময় প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশের ভিত্তিতে নির্বাচিত পণ্যচালান বিদ্যমান জনবল দিয়ে কায়িক পরীক্ষা করাই যেখানে দুরূহ, সেখানে সব পণ্যচালানে কায়িক পরীক্ষা করার বিষয়টি প্রায় অসম্ভব এবং সরকারের ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কমিটমেন্টের পরিপন্থি।
এনবিআরের চিঠিতে আরও জানানো হয়েছে, সকল পরীক্ষা করা হলে যেকোনো পণ্যচালান খালাসে অনেক দেরি হবে। বন্দরের মধ্যে পণ্যজট সৃষ্টি হবে। আমদানিকারকের ব্যয় বাড়বে। বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বন্দরের দক্ষতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। দ্রুততম সময়ে পণ্যচালান খালাসের উদ্দেশ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ১০টি কন্টেইনার স্ক্যানার স্থাপন করেছে এবং আরও ছয়টি স্ক্যানার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসব স্ক্যানার স্থাপিত হলে আরও দ্রুত পণ্য খালাস করা সম্ভব হবে। তবে সকল পণ্যচালান খালাসের পূর্বে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করার বিষয়টি বাস্তবসম্মত হবে না, বরং তা দেশের বাণিজ্য সহজীকরণের উদ্যোগের পরিপন্থি হবে।
জানা গেছে, আমদানি-রপ্তানি পণ্যচালান দ্রুত খালাস একটি দেশের বন্দরের দক্ষতা ও ব্যবসায়ের সহজীকরণ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্টে (টিএফএ) সদস্য দেশগুলো আমদানি পণ্যের খালাস প্রক্রিয়া ন্যূনতম হস্তক্ষেপের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খালাসের জন্য অঙ্গীকার করা হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে খুবই নগণ্য পরিমাণ পণ্য কায়িক পরীক্ষা করে থাকে। বাংলাদেশ কাস্টমস প্রথাগতভাবে আমদানি পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় নির্বাচন পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ পণ্যচালান কায়িক পরীক্ষা করে থাকে।
উল্লেখ্য, একটি পণ্যচালানে পণ্যের পরিমাণ ১০ থেকে ১২টি ৪০ ফুট কন্টেইনার বা এমনকি বাল্ক পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত হতে পারে।
চিঠিতে আরও জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আমদানি-রপ্তানি পণ্যচালানের কাস্টোডিয়ান অর্থাৎ রক্ষক হচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরের ক্ষেত্রে তা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং আকাশপথে আমদানির ক্ষেত্রে তা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন।
এনবিআরের চিঠিতে জানানো হয়েছে, শতভাগ কায়িক পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে উক্ত কাজের জন্য ব্যয়িত অর্থ আমদানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া দ্রুততম সময়ে জনবল নিয়োগের বিষয়টি বেসরকারি দপ্তরে সম্ভব হলেও সরকারি দপ্তরে তা দুরূহ। ২০১১ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগের সর্বশেষ দাপ্তরিক ও জনবল সম্প্রসারণ হয়েছে। তবে বিগত ১৩ বছরে বাণিজ্যের আকার অনেকগুণ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে জনবলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি। অনুমোদিত জনবলের অর্ধেকেরও কম জনবল নিয়ে শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও দ্রুততম সময়ে পণ্যচালান খালাসের কাজ সম্পাদিত হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে কাস্টমস দপ্তরের সম্প্রসারণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।