জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৩ ১১:২১ এএম
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩ ১২:৪৮ পিএম
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঁধে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে সক্ষমতা বিবেচনা না করে লক্ষ্য নির্ধারণ করায় অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। মূলত ডলার সংকট, পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়া, এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) কমে যাওয়ার কারণে ভাটা পড়েছে রাজস্ব আহরণে।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১১ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে এনবিআর আদায় করেছে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মূল্যস্ফীতির কারণে ভ্যাট আহরণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা ভালো থাকলেও আমদানি-রপ্তানি এবং আয়কর খাতের রাজস্ব আহরণ তলানিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আমদানি-রপ্তানি খাতের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৬৪ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৮৩ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমদানি-রপ্তানি খাতে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে আয়কর খাতের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে আয়কর খাতের রাজস্ব ঘাটতি ৩ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। উচ্চ মূলস্ফীতি থাকার পরও অর্থবছরের ১১ মাস শেষে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি রয়েছে। এ সময় ভ্যাট আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা।
এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের ১১ মাসে এনবিআর আদায় করেছে ২ লাখ ৮০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এক মাস হাতে রেখে ঘাটতি ৩৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এনবিআরকে আগামী মাসে আদায় করতে হবে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা অসম্ভব বলেও মনে করেন খোদ এনবিআর কর্মকর্তারা।
তারা বলছেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থবছরের শেষ মাসে রাজস্ব একটু বাড়ে। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। বছর শেষে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি থাকবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি বিবেচনায় না নিয়ে নতুন বছরের বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা আদায়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এনবিআর।
চলতি অর্থবছরের এই চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে এনবিআরকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মতো আগামী অর্থবছরের বাজেটেও লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
আমদানি শুল্ক কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে ডলার সংকটের কারণে আমদানি নীতিতে কড়াকড়ি, ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়া, ঋণপত্র খুলতে না পারা, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং বিলাসী দ্রব্যের আমদানি কমে যাওয়ার কারণে আমদানি কমে গেছে। এ কারণে আমদানি খাত থেকে শুল্ক-কর আদায়ের পরিমাণও কমেছে।
বাংলাদেশের খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশির ভাগ পণ্যই আমদানি করতে হয়। কিন্তু আমদানি খাতে শুল্ক বেশি আসে গাড়ি ও বিলাসবহুল বিভিন্ন পণ্য থেকে। কিন্তু এই অর্থবছরে এ-জাতীয় পণ্য আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে।
গত বছরের মে মাস নাগাদ বাংলাদেশে ডলার সংকট শুরু হওয়ার পর এলসির মার্জিন বৃদ্ধি, বিলাসবহুল পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়াসহ কড়াকড়ি এবং নজরদারি বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ঋণপত্র খোলার হার কমে গেছে এক-চতুর্থাংশ। বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্য, ইন্টারমিডিয়েট পণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমে গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক ড. এমএ রাজ্জাক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সামনের বছরের যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে, এটা অর্জন করাটা কঠিন হবে। এখনও আমাদের রাজস্বের বড় একটি অংশ আসে আমদানি থেকে। কাজেই আমদানি যদি স্থবির হয়ে থাকে, তাহলে সেটার ওপর একটা প্রেশার পড়বে। এ ছাড়া আমদানি কমে যাওয়া মানে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা জানি যখন প্রবৃদ্ধি ভালো হয়, তখন রাজস্ব আদায় করা সহজ হয়। সেটা কিন্তু খানিকটা বাধাগ্রস্ত হবে।’
এ থেকে উত্তরণের জন্য কর-নেট বাড়ানো জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক মানুষ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কর-নেটের আওতায় আসেনি। এ পদ্ধতি এনবিআর ব্যবহার করতে পারে।’