হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৩ ২১:৫৬ পিএম
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩ ০৯:৫৯ এএম
প্রতীকী ছবি
২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ৫ মাস ১০ দিনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ আমদানি হয়েছিল ২ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন। এবার একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৬২৩ মেট্রিক টন। সেই হিসেবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার এলাচ আমদানি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। ফলে বাজারে মসলার দাম বেড়েই চলেছে। আসন্ন কোরবানি ঈদ ঘিরে মসলার দাম কমার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
আমদানিকারকরা বলছেন, শতভাগ মার্জিন পরিশোধসহ পর্যাপ্ত এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে না পারার কারণেই এলাচ আমদানি কমেছে। অনেক সময় এলসির সমপরিমাণ টাকা পরিশোধ করে আমদানি পণ্য ঠিক সময়ে খালাস করতে পারছেন না তারা। ব্যাংক এলসির টাকা রপ্তানিকারককে সময়মতো রিলিজ দিতে না পারার কারণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। যে কারণে শুধু এলাচ নয়, এখন অন্যান্য মসলা আমদানিও কমছে।
আমদানি কম হওয়ার পাশাপাশি মসলা আমদানিতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা। তারা বলছেন, মসলা আমদানিতে এখন আগের তুলনায় চারগুণ বিনিয়োগ বেড়েছে। আগে মসলার একটি চালানে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হতো, একই টাকা দিয়ে সমপরিমাণ মসলার অন্তত তিন চালান আমদানি করা যেত। বিনিয়োগ বেশি করতে হয় বলেই এখন আমদানিকারকরা আমদানি খরচের চেয়ে বেশি দামে মসলা বিক্রি করছেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গত বছরের প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় এবার চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে শুধু এলাচ আমদানি কম হয়েছে তাই নয়, একই সময়ে জিরা, লবঙ্গ, আদাসহ বেশ কয়েকটি মসলাজাতীয় পণ্যের আমদানি কমেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ আমদানি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ আমদানি হয়েছে ২ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন। কিন্তু এ বছর একই সময়ে এলাচ আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৬২৩ মেটিক টন। অন্যদিকে জিরা আমদানি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। গত বছরের প্রথম ৫ মাস ১০ দিনে জিরা আমদানি হয়েছিল ৬ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন। সেখানে এবার প্রথম ৫ মাস ১০ দিনে জিরা আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯১৪ মেট্রিক টন। তবে একই সময়ে এর ৯০ শতাংশ বেশি জিরা আমদানি হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে স্থলবন্দর দিয়ে জিরা আমদানি হয়েছে ১১ হাজার ৬৮৮ মেট্রিক টন।
লবঙ্গ আমদানি কমেছে প্রায় ৯৬ শতাংশ। গত বছরের প্রথম ৫ মাস ১০ দিনে লবঙ্গ আমদানি হয় ২৩ হাজার ৫৩৮ মেট্রিক টন। সেখানে এবার প্রথম ৫ মাস ১০ দিনে লবঙ্গ আমদানি হয়েছে মাত্র ৮৫৯ মেট্রিক টন। আদা আমদানি কমেছে ৪৭ শতাংশ। গত বছরের প্রথম ৫ মাস ১০ দিনে আদা আমদানি হয়েছে ১৬ হাজার ৯৭৭ মেট্রিক টন। সেখানে এবার একই সময়ে আদা আমদানি হয়েছে ৮ হাজার ৯২৯ মেট্রিক টন।
আমদানি কম হওয়ায় পাইকারি বাজারে বাড়ছে মসলার দাম। ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দুই মাসের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে প্রায় সব ধরনের মসলা পণ্যের দাম বেড়েছে। মার্চ মাসের শুরুর দিকে যেখানে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়, সেগুলো এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। জিরা বিক্রি হয়েছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, যেখানে এখন খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায়। অন্যদিকে লবঙ্গ বিক্রি হয়েছিল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়, এখন প্রতি কেজি লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। দুই মাস আগে জয়ত্রী বিক্রি হয়েছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়, এখন সেখানে প্রতি কেজি জয়ত্রী বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায়।
এদিকে এলাচ, জিরা, লবঙ্গ, আদা আমদানি কমলেও একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রসুন ও দারুচিনি আমদানি বেড়েছে। দারুচিনি আমদানি বেড়েছে প্রায় ১১০ শতাংশ। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ জুন পর্যন্ত সাড়ে ৫ মাসে দারুচিনি আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৪৫ মেট্রিক টন। সেখানে এবার একই সময়ে দারুচিনি আমদানি হয়েছে ৮ হাজার ৪৯৮ মেট্রিক টন। অন্যদিকে রসুন আমদানি বেড়েছে ৬ হাজার ৪০ শতাংশ। গত বছরের প্রথম ৫ মাস ১০ দিনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রসুন আমদানি হয়েছে মাত্র ৫৯৪ মেট্রিক টন। সেখানে এবার একই সময়ে রসুন আমদানি হয়েছে ৩৬ হাজার ৫২৬ মেট্রিক টন।
আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আমদানিকারক আব্দুর রাজ্জাক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ডলারের সংকটের কারণে তারা চাহিদামতো এলসি করতে পারছেন না। ব্যাংক আমদানিকারকদের মধ্যে বাই রোটেশন করে এলসি করার সুযোগ দিচ্ছে। আবার শতভাগ মার্জিন পরিশোধ করে এলসি খুললেও মাল আসার পর দেখা যায় ব্যাংক রপ্তানিকারকের অ্যাকাউন্টে টাকা রিলিজ করতে পারছে না। এতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। এসব কারণে এখন মসলা আমদানি কমেছে।
তিনি আরও বলেন, ’মসলা আমদানিতে গড়ে এক মাস থেকে সাড়ে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। ভারত থেকে স্থলপথে মসলা আমদানি করলে সেগুলো আসতে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। চীন, ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করলে এক মাস থেকে ৪০ দিন সময় লাগে। আবার গুয়েতেমালা থেকে এলাচ আমদানি করলে সেগুলো আসতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। চার মাস পর যে মাল আমদানি করা হয়, সেগুলো চাইলেও আমদানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিক্রি করা যায় না।