সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৩ ১৪:১২ পিএম
একসময় দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি হতো গৃহস্থালি ও সৌখিন পণ্যসামগ্রী। প্রবা ফটো
একসময় গৃহস্থালির বেশিরভাগ জিনিসপত্র তৈরি করা হতো বাঁশ, বেত কিংবা কাঠে। সময়ের পরিবর্তনে বাঁশ ও বেত শিল্পের জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক। তৈজসপত্রের প্রায় সবকিছুতে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ায় দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ বেতের শিল্পকলা, আর্থিক সংকটে শিল্পীরা।
বাংলার অন্যান্য গ্রামের মতোই সবুজ শ্যামল একটি গ্রামের নাম সুদক্ষিরা। ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানায় গ্রামটি অবস্থিত। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, শান্ত এই গ্রামের ভেতরে কী কাজ হচ্ছে। কাজের কোনো শব্দও বাইরে খুব একটা আসে না। শব্দ, হইচই নেই, কিন্তু এই সুদক্ষিরা গ্রামেই আছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত দিয়ে পণ্য তৈরির গুটিকয়েক কারিগর। গ্রামবাসী তাদের ঋষি সম্প্রদায় হিসেবে চেনে।
বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দেখা গেল বাড়ির উঠানে বাঁশ ও বেতের সংমিশ্রণে তৈরি ধান মাপার পালা, ধামা, সের, ঢোল, ঝাড়ু সারিবদ্ধভাবে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। ঘরে বসে অনেকে এসব পণ্যে বার্নিশ দিচ্ছে।
এ গ্রামেরই এক পরিবারের দুই ভাই সুখ চাঁন ও রুক চাঁন। তারা এখনও এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। এই গ্রামে বর্তমানে শুধু তারাই বাঁশ-বেত দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি করেন। একসময় গ্রামের অধিকাংশ ঋষি বাঁশ-বেত শিল্পর সঙ্গে জড়িত ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাজের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু তারা দুই ভাই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনও তৈরি করছেন বাঁশ-বেত দিয়ে হরেকরকম পণ্য। বহু দূর-দূরান্ত থেকে বাঁশ-বেত কিনে এনে সেগুলো দিয়ে নানারকম জিনিসপত্র তৈরি করেন তারা। সেগুলো স্থানীয় বাজারে ও গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন তারা।
একসময় ঋষি সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষ থেকে শুরু করে প্রায় অধিকাংশ মানুষ বেত দিয়ে ধান মাপার পালা, ধামা, সের, ঝাড়ু, ঢোল বানাতেন। দিন গড়াতে থাকে। আধুনিক মানুষের পালা, আগৈল, ধামার ব্যবহার কমতে থাকে। চলে আসে প্লাস্টিক, ধাতব জিনিসের ব্যববহার। বাধ্য হয়েই সুদক্ষিরা গ্রামের ঋষি সম্প্রদায়ের লোকেরা কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করেছেন।
সিংগাইর থেকে ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বেত শিল্প। বেতের তৈরি পণ্যের আর কদর নেই বললেই চলে। ঐতিহ্য হারাতে বসেছে এই শিল্প। একসময় গ্রামীণ জনপদের মানুষ গৃহস্থালি, কৃষি ও ব্যবসা ক্ষেত্রে বেত ও বাঁশের তৈরি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা হলেও এখন বিলুপ্তির পথে শিল্পটি। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত সবখানেই ব্যবহার করা হতো বাঁশ ও বেতের তৈরি আসবাবপত্র। এখন সময়ের বিবর্তনে বদলে গেছে চিরচেনা চিত্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্লাস্টিকসামগ্রীর কদর বেড়ে যাওয়া এই কুটির শিল্পের চাহিদা এখন আর নেই। তা ছাড়া দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে এই শিল্পের কাঁচামাল বাঁশ ও বেত। বাজারগুলো দখল করেছে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম। দেখা মেলে না আর বাঁশঝাড়। তা ছাড়া প্লাস্টিক পণ্য টেকসই ও স্বল্পমূল্যে পাওয়ায় সাধারণ মানুষের চোখ প্লাস্টিকসামগ্রীর ওপর।
জানা যায়, একসময় দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি হতো গৃহস্থালি ও সৌখিন পণ্যসামগ্রী। বাঁশঝাড় থেকে তরতাজা বাঁশ-বেত কেটে গৃহিণীরা তৈরি করতেন হরেকরকম পণ্য। এসব বিক্রি করেই চলত তাদের জীবনযাপন। তবে এখনও গ্রামীণ উৎসব ও মেলাগুলোতে বাঁশ ও বেতজাত শিল্পীদের তৈরি খোল, চাটাই, খালুই, ধামা, টোনা, পাল্লা, মোড়া, বুক সেলফ খুব কমই চোখে পড়ে।
যতই দিন যাচ্ছে ততই কমে যাচ্ছে এই হস্তশিল্পের চাহিদা। মূল্যবৃদ্ধি, বাঁশ-বেতের দুষ্প্রাপ্যতা, অন্যদিকে প্লাস্টিক, সিলভার ও মেলামাইন জাতীয় হালকা টেকসই সামগ্রী নাগরিক জীবনে গ্রামীণ হস্তশিল্পের পণ্যকে হটিয়ে দিয়েছে।
উপজেলার সুদক্ষিরা গ্রামের সুখ চাঁন বলেন, ‘আমার বাবা করতেন বাঁশ-বেতের আসবাপত্রের কাজ। বাবার পেশা ধরে রাখতে ৫৫ বছর যাবৎ আমি ও আমার ভাই এই কাজের সঙ্গে জড়িত। বেত শিল্পকে বর্তমানে শুধু আমাদের পরিবারটাই আঁকড়ে ধরে রেখেছে।’ অনেকে এ পেশা বদলে অন্য পেশায় গেলেও পূর্বপুরুষের পেশাকে কিছুতেই ছাড়তে পারেনি। তারা এসব পণ্য স্থানীয় বাজার ও গ্রামগঞ্জে নিয়ে ঘোরাফেরা করলে কিছু সৌখিন মানুষ এগুলো কেনেন। বেলা শেষে যা বিক্রি হয় তা দিয়ে তরকারি কিনে বাড়ি ফেরেন।