হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৩ ১০:০০ এএম
গত বছরের ৪ জুন বিএম কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর জানা যায়, রপ্তানির জন্য ওই ডিপোতে রাখা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে।
বিএম ডিপোর বিস্ফোরণের পর বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পর বিপজ্জনক পণ্য হান্ডলিং নিয়ে আগে থেকে আরও বেশি তৎপর হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সে সময় বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বিপজ্জনক পণ্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খালাস করার নির্দেশনা দেয়া হয়। এর পর বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা বিপজ্জনক পণ্যের তালিকা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস (আইএমডিজি) কোড অনুযায়ী, বিপজ্জনক পণ্য নির্ধারিত তাপমাত্রায় পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা (আইএমও) প্রণীত আইএমডিজি কোডে এমন নির্দেশনা থাকলেও এতদিন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত শেড ছাড়াই আমদানি-রপ্তানির বিপজ্জনক পণ্য সাধারণ শেডে রাখত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এবার আইএমডিজি কোড অনুযায়ী বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মাণ হতে যাচ্ছে অত্যাধুনিক তাপ নিয়ন্ত্রিত ‘স্টেট অব আর্ট’ কেমিক্যাল শেড। বন্দর প্রতিষ্ঠার ১৩৬ বছরে এসে ঘুচতে যাচ্ছে কেমিক্যাল শেড না থাকার অপ্রাপ্তি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতলবিশিষ্ট এই স্টেট অব আর্ট কেমিক্যাল শেড নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর। বন্দরের ১ নম্বর জেটিসংলগ্ন সীমানা প্রাচীরের সঙ্গেই এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর আয়তন ২২ হাজার ৪০০ বর্গফুট। ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুযায়ী শেডে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। এখানে ফায়ার প্রোটেকশন, ডিটেকশনে স্মোক ডিটেক্টর, হিট ডিটেক্টর, ফায়ার হাইড্রেন্টসহ অগ্নিনির্বাপণের আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকবে। অন্যদিকে ভিআরএফ প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রিত হবে তাপমাত্রা।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী তারেক মাহমুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সিডিউল অনুযায়ী আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা। নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আমরা আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতলবিশিষ্ট এই কেমিক্যাল শেডে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ভিআরএফ সিস্টেমসহ অগ্নিনির্বাপণের জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। শেডের নিচতলায় দুটি লিফট, একটি অফিস রুমসহ তিনটি চেম্বার থাকবে। এর মধ্যে মাঝখানের চেম্বারে পোলার এবং নন-পোলার দুই ধরনের পণ্য রাখা যাবে। দোতলা পুরোটা একটি চেম্বার হিসেবে থাকবে। ৯ নম্বর শ্রেণিভুক্ত বিপজ্জনক পণ্যগুলো এখানে রাখা হবে।’
আইএমডিজি বিপজ্জনক পণ্যগুলোকে ৯টি শ্রেনিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি শ্রেণিভুক্ত বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্য নির্ধারিত তাপমাত্রায় রাখতে হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন তৈরি হতে যাওয়া স্টেট অব আর্ট কেমিক্যাল শেডে আইএমডিজি কোড অনুযায়ী যেসব বিপজ্জনক পণ্য তাপ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখতে হয়, ওই চার শ্রেণির পণ্যই এই শেডে রাখা হবে। দ্বিতলবিশিষ্ট এই শেডে নিচতলায় ক্লাস-৩ (দাহ্য তরল বিপজ্জনক পদার্থ), ক্লাস-৮ (ক্ষয়কারী বিপজ্জনক পণ্য) এবং ক্লাস-৬ (বিষাক্ত এবং সংক্রমক বিপজ্জনক পণ্য) সংরক্ষণ করা হবে। দোতলায় ক্লাস-৯ (বিবিধ রাসায়নিক বিপজ্জনক পণ্য) রাখা হবে।
এ সম্পর্কে বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্টেট অব আর্ট মানেই হলো যুগোপযোগী। অর্থাৎ যেটি যেভাবে ব্যবস্থাপনা করা দরকার, ঠিক সে রকম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। সে অনুযায়ী নতুন নির্মাণ হতে যাওয়া শেডটি হবে অত্যাধুনিক, সর্বাধুনিক। এখানে বিপজ্জনক পণ্যগুলো আইএমডিজি কোড অনুযায়ী যে তাপমাত্রায় ব্যবস্থাপনা করার কথা বলা হয়েছে, ঠিক সে মাত্রায় ব্যবস্থাপনা করা হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাপ নিয়ন্ত্রিত শেড না থাকার কারণে এতদিন বাংলাদেশে মাইনাস ১০ ডিগ্রি, মাইনাস ১৫ ডিগ্রি, মাইনাস ২০ ডিগ্রিতে যেসব কেমিক্যাল রাখতে হয়, সে ধরনের রাসায়নিক পণ্যের এলসিএল কার্গো আসতেই পারত না। কারণ আমরা ঘোষণা দিয়েই রেখেছিলাম এগুলো রাখার মতো আমাদের কেমিক্যাল শেড নেই। স্টেট অব আর্ট কেমিক্যাল শেড তৈরির পর আমাদের এ সংকট কেটে যাবে। তখন বাংলাদেশেও এ ধরনের কার্গো আনা যাবে।’
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বন্দর সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইএমডিজি কোড অনুযায়ী ৩, ৬, ৮ এবং ৯ শ্রেণিভুক্ত বিপজ্জনক পণ্য তাপ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখতে হয়। এ ধরনের কেমিক্যাল শেড না থাকায় এতদিন বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে এটি করা সম্ভব হতো না। নতুন আধুনিক এই কেমিক্যাল শেড তৈরি হলে বন্দরের এ সংকট কেটে যাবে। বন্দরের অভ্যন্তরে কেমিক্যাল বিস্ফোরণের ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।’