হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৩ ১৪:৩৪ পিএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৩ ১৫:০৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
খুচরায় উন্নতমানের এক কেজি আজওয়া, মরিয়ম খেজুরের দাম ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা। অন্যদিকে কম মানের জাহিদি খেজুর প্রতি কেজি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। দুই ধরনের খেজুরের দাম দুই রকম হলেও এতদিন এসব খেজুর আমদানি করা হতো একই এইচএস কোড ব্যবহার করে।
অর্থাৎ কম দামের খেজুরের দামেই শুল্কায়ন হতো উন্নতমানের খেজুরের। এতে রাজস্ব হারাত সরকার। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি লেখালেখির পর খেজুরের শুল্কায়নে নতুন নিয়ম চালু করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস।
গত ৩ এপ্রিল চালু করা নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে খেজুরের মানের ওপর ভিত্তি করে শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে প্রিমিয়াম গ্রেড (উন্নতমানের) খেজুর প্রতি কেজি ৪ ডলার, মিডিয়াম গ্রেডের (মাঝারি মান) খেজুর প্রতি কেজি ২ ডলার এবং লোয়েস্ট গ্রেডের (নিম্নমান) খেজুর প্রতি কেজি ১ ডলার করে শুল্কায়ন করা হবে।
কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মহিউদ্দিন পাটোয়ারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন আদেশ আসার পর গত ৩ এপ্রিল থেকে আমরা প্রিমিয়াম গ্রেড (উন্নতমানের), মিডিয়াম গ্রেড (মাঝারি মান) এবং লোয়েস্ট গ্রেড (নিম্নমান) এই তিন ক্যাটাগরিতে খেজুরের শুল্কায়ন করছি। গ্রেড কীভাবে নির্ধারণ করেন-- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমদানিকারকের দেওয়া নমুনা দেখে আমরা গ্রেড নির্ধারণ করি। পরে সে অনুযায়ী, শুল্কায়ন করা হয়।’
নতুন নিয়মে খেজুরের শুল্কায়নে ফাঁকিবাজির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকরা বলছেন, নতুন নিয়ম অনুযায়ী কাস্টমস কর্মকর্তারা নমুনা দেখে খেজুরের ক্যাটাগরি নির্ধারণ করেন। নমুনা দেখে খেজুরের কোয়ালিটি নির্ধারণ করায় কাস্টমস কর্মকর্তারা অনৈতিক সুযোগ নিচ্ছেন। আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে অনেক সময় প্রিমিয়াম গ্রেডের খেজুর মিডিয়াম গ্রেডের খেজুর বলে শুল্কায়ন করছেন। আবার ঘুষ দিতে না চাইলে মিডিয়াম গ্রেডের খেজুর জোর করে প্রিমিয়াম গ্রেডের বলে শুল্কায়ন করছেন।
অন্যদিকে ভিন্ন কথা বলছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা, তারা বলছেন-- শুধু নমুনা দেখে ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হচ্ছে না। আদেশে কোন দেশ থেকে এলে কোন ক্যাটাগরিতে পড়বে, সেটি নির্ধারণ করা আছে। সে হিসাবেই খেজুরের শুল্কায়ন করা হচ্ছে। তাই শুল্কায়নের ক্ষেত্রে ফাঁকিবাজি করার সুযোগ খুব একটা নেই। কিন্তু নতুন নিয়মে চাইলে আমদানিকারকরা অনিয়ম করার সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ চাইলে সৌদি আরব থেকে প্রিমিয়াম গ্রেডের খেজুর বস্তায় এনে সেটি মিডিয়াম গ্রেডের বলে চালিয়ে দিতে পারছেন।
কাস্টমস হাউসের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই থেকে জানুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৩ কোটি ৯ লাখ ১১ হাজার ৮৫৯ কেজি খেজুর আমদানি করেন আমদানিকারকরা। ওই খেজুরের বিল অব এন্ট্রি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আমদানিতে প্রতি কেজির সর্বোচ্চ শুল্কায়ন মূল্য পড়ছে ১০৮ থেকে ১১০ টাকা। সর্বনিম্ন শুল্কায়ন মূল্য পড়ছে প্রতি কেজি ৫৩ থেকে ৫৫ টাকা। শুল্ককর পরিশোধ করার পর এই খেজুরগুলোই বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ এক হাজার এবং সর্বনিম্ন ২৫০ টাকায়। জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে ৩০০ টন খেজুর আমদানি করেছে চট্টগ্রামের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘মদিনা ডেটস অ্যান্ড নাটস’।
গত ২৬ জানুয়ারি দাখিল করা এসব খেজুরের বিল অব এন্ট্রি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আমদানি করা প্রতি কেজি খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য পড়েছে ৫৩ দশমিক ৮২ টাকা। এ তথ্য তুলে ধরে গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আমদানির পরও বাজারে খেজুরের দাম কেন বাড়ছে, সেটি নিয়ে অনুসন্ধান চালায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
খেজুর আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে জেলা প্রশাসন দেখতে পায়, রমজানের আগে গত এক বছরে যেসব খেজুর আমদানি করা হয়েছে তার সবগুলো একই এইচএস কোড দিয়ে আনা হয়েছে। এর পর কম দামে এনে বেশি দামে খেজুর বিক্রির দায়ে গত ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম নগরীর ফলমন্ডিতে অভিযান চালিয়ে তিন খেজুর ব্যবসায়ীকে জরিমানা করার পর নতুন নিয়মে শুল্কায়নের আদেশ দেয় এনবিআর।
গত ৩ এপ্রিল জারি করা নতুন আদেশে বলা হয়, এখন থেকে খেজুরের মানের ওপর ভিত্তি করে শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে প্রিমিয়াম গ্রেডের খেজুর প্রতি কেজি ৪ ডলার, মিডিয়াম গ্রেডের খেজুর প্রতি কেজি ২ ডলার এবং লোয়েস্ট গ্রেড খেজুর প্রতি কেজি ১ ডলার করে শুল্কায়ন করা হবে। আদেশে আরও বলা হয়, সৌদি আরব থেকে ছোট প্যাকেটে এলে সেগুলো প্রিমিয়াম গ্রেড আর বস্তায় এলে সেগুলো মিডিয়াম গ্রেড হিসেবে শুল্কায়ন করা হবে। এ ছাড়া ইরাক ও মিশর থেকে এলে সেগুলো লোয়েস্ট গ্রেড হিসাবে শুল্কায়ন করা হবে।
এনবিআরের নতুন এই আদেশ জারির পর খেজুরের শুল্কায়নে অনিয়ম আরও বেড়েছে। আমদানিকারক ও কাস্টমস কর্মকর্তারা দুপক্ষই অনিয়ম করছেন বলে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমদানিকারক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে যেভাবে শুল্কায়ন করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তারা লাভবান হচ্ছেন। এটি অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তাদের ঘুষ খাওয়ার পথ সুগম করেছে। ঘুষ দিলে প্রিমিয়াম গ্রেড হয়ে যাচ্ছে মিডিয়াম গ্রেড আর না দিলে মিডিয়াম গ্রেডকে প্রিমিয়াম গ্রেড বলে শুল্কায়ন করার চেষ্টা করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের উপকমিশনার ব্যারিস্টার মো. বদরুজ্জামান মুন্সি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘খেজুরের শুল্কায়ন নিয়ে এনবিআর থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তাতে কোন দেশ থেকে কীভাবে আনলে সেটি প্রিমিয়াম গ্রেড বা মিডিয়াম গ্রেডে পড়বে সেটি সুনির্দিষ্ট করা আছে। যেমন সৌদি আরব থেকে যদি ছোট কার্টনে আসে-- সেটি প্রিমিয়াম গ্রেড, আবার বস্তায় আনা হলে সেটি মিডিয়াম গ্রেড। ইরাক থেকে খেজুর এলে সেগুলো নিম্নমানের খেজুর। তাই শুল্কায়নের ক্ষেত্রে ফাঁকিবাজি করার সুযোগ খুব একটা নেই।’
খেজুরের নতুন শুল্কায়ন আদেশে অনিয়ম করার সুযোগ আছে জানিয়ে মো. বদরুজ্জামান মুন্সি বলেন, ‘অনিয়মটা করতে পারবেন শুধু আমদানিকারক। কেউ যদি শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার জন্য প্রিমিয়াম গ্রেডের খেজুর বস্তায় ভরে নিয়ে আসেন, তাহলে তো আমাদের কিছু করার নেই। আদেশে বলে দেয়া হয়েছে-- সৌদি আরব থেকে বস্তায় করে আনা হলে সেটি মিডিয়াম গ্রেড, আবার ইরাক থেকে প্রিমিয়াম গ্রেডের খেজুর নিয়ে এলে সেটিও লোয়েস্ট গ্রেডে পড়বে। এখানে তো আমাদের কিছু করার নেই। কোনো আমদানিকারক এ ধরনের অনিয়ম করছেন কি না আমরা সেটি খতিয়ে দেখব। যদি দেখি প্রিমিয়াম গ্রেডের খেজুর বস্তায় করে আনা হচ্ছে, তাহলে আমরা মিডিয়াম গ্রেডের খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য বাড়িয়ে দেব। আর আমাদের কোনো কর্মকর্তা যদি অনিয়ম করেন, আমরা তার বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন অনুযাযী ব্যবস্থা নেব।’