শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৩ ১৯:১০ পিএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৩ ১৬:৪৫ পিএম
কীটনাশকমুক্ত ধান উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজিজুল হকের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই সাফল্য পেয়েছে।
ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৯২, ব্রি-৩৪ ও জিরাশাইলসহ মোট ৬টি জাতের ধানের ওপর গবেষণা চালিয়ে এই সফলতা পেয়েছেন তারা। রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে এনে দ্বিগুণ ফলনের লক্ষ্যেও কাজ করে যাচ্ছে গবেষণা দলটি। এরই মধ্যে বেগুন ও টমেটো চাষে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারে সাফল্য পেয়েছেন তারা।
কৃষক ও গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রচলিত ব্রি-২৮ (বোরো) এবং ব্রি-৩৪ (আমন) জাতের ধানগুলো ব্লাস্টসহ অন্যান্য রোগের জন্য বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। এমনকি ধান ঘরে তোলার ১৫ দিন আগেও ব্লাস্ট প্রতিরোধের জন্য উচ্চমাত্রায় বিষ প্রয়োগ করতে হয়। এতে ধান উৎপাদন প্রায় ২০-৩০ শতাংশ কমে যায়।
তারা আরও জানান, প্রতি বছর ইউরিয়া সার ব্যবহারে কৃষকের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়; যা ইউরিয়া সার উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকি ও গ্যাসের ব্যবহার দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
গবেষকরা বলেন, ধান গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকারী অ্যান্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া গাছের শিকড়, কান্ড, শাখা ও প্রশাখা বৃদ্ধির মাধ্যমে নাইট্রোজেনের বাড়তি জোগান বায়ুমণ্ডল থেকে সংগ্রহ করে। এতে ইউরিয়া সারের প্রয়োগ ৫০-৭০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
গবেষক দলের সদস্যরা জানান, গবেষণায় কিছু অ্যান্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রণ সৃষ্টি করা হয়, যারা অক্সিন হরমোন, এসিসি ডি-আমেনেজ এনজাইম তৈরি করে। এছাড়া তারা বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন ফিক্সেশন করে থাকে। এসব ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগে ব্রি-২৮ ধানের উৎপাদন গড়ে প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
কৃষকের সঙ্গে ফিল্ড ট্রায়ালের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ ইউরিয়া প্রয়োগ কমিয়ে মাত্র ১ বার (ধান রোপনের প্রথম মাসে) বিষ প্রয়োগ করে ধানের উৎপাদন ৫০-৫৫ শতাংশ বেড়েছে বলে জানায় গবেষকদল ।
প্রধান গবেষক ড. আজিজুল হক বলেন, তারা মূলত তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছেঠন। রাসায়নিক ও কীটনাশকের উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা, অধিক ফলন এবং ধানের গুণগত মান বৃদ্ধি। ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনা হয়েছে। এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। এছাড়া তারা ধানের (ব্রি-৩৪) ফলন ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পেরেছেন। গবেষণালব্ধ ধানের গুণগত মানও ভালো। এতে ধানে চিটার পরিমাণ কম হয়। এছাড়াও ধানের শীষে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কাটার উপযুক্ত হয়। এটি হাওড় অঞ্চলের মানুষদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
শুধু যে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে বায়োফার্টিলাইজার আবিষ্কার করেছে তা নয়, ওই ব্যাকটেরিয়া উৎপাদনের নতুন কৌশল ও প্রযুক্তিও তৈরি করেছে গবেষক দলটি।
ড. আজিজুলের নেতৃত্বে এই গবেষণায় সম্পৃক্ত হয়েছেন যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র তানভীর, শাহরিয়ার, মেহেদী ও রোকন। এতে করে খুব অল্প খরচে কৃষক বাড়িতেই সাধারণভাবে ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে নিজেরাই ধান ক্ষেতে তা প্রয়োগ করতে পারবেন।
আজিজুল হকের এই গবেষণায় আর্থিক সহযোগিতা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (আইআরটি)।