জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৩ ১২:৫০ পিএম
বাণিজ্য বাধা কমাতে ও মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের সঙ্গে ব্যবসা সহজ করতে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ২০০টি শুল্ক লাইনের পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক পরিবর্তনের চিন্তা করছে সরকার। এই পরিবর্তনের অধীনে এসব পণ্যের সম্পূরক শুল্ক কমতে পারে বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার হতে পারে। তবে মদ, সিগারেট, গাড়ি ও আগ্নেয়াস্ত্রের সম্পূরক শুল্ক এই বিবেচনায় থাকছে না। তবে এসব পণ্যের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোরও কোনো পরিকল্পনা নেই।
পরবর্তী তিন অর্থবছরের বাজেটে সরকার এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির বাধা কমাতে ৪০০-৪৫০টি শুল্ক লাইনে সম্পূরক শুল্কে পরিবর্তন করবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন পণ্যে সম্পূরক শুল্ক থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তা অন্তরায় হবে। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এমনিতেই বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রভাব পড়বে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পর্যালোচনায় তিনটি বিভাগে যোগ্যতা অর্জন করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হওয়ার কথা বাংলাদেশের।
সূত্র জানায়, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ধাপ উন্নীত হলে আমাদের প্রয়োজন হবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি। সেক্ষেত্রে একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে গেলে তারা যদি দেখে তাদের রপ্তানি পণ্যের ওপর অধিকহারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তাহলে তারা নিরুৎসাহিত হবে। অনেক ক্ষেত্রে অপমানিত বোধ করতে পারে। ফলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের কথা মাথায় রেখে ভিন্নভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।
জানা গেছে, পণ্য আমদানিতে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ ট্যারিফ লাইন আছে। যেখানে ১ হাজার ৯২৬টি শুল্ক লাইনে সম্পূরক শুল্ক রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যমান প্রায় সাড়ে তিন হাজার ট্যারিফ লাইন থেকে ২০০-২৫০ ট্যারিফ লাইনের ওপর রেগুলেটরি ডিউটি পরিবর্তন (প্রত্যাহার বা কমানো) করা হবে।
বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ আরও বাড়িয়ে তুলবে কি নাÑ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে আমরা একটি গবেষণা করে দেখেছি, যেসব পণ্যের ওপর এই শুল্কহার কমানো বা উঠিয়ে দেওয়া হবে, সাধারণত বাংলাদেশে ওইসব পণ্যের চাহিদা কম। কাজেই এতে করে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের ওপর প্রভাব পড়বে না। এ ছাড়া এসব পণ্যের বেশিরভাগই আমদানিনির্ভর, তাই দেশীয় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, এনবিআরের কাঁধে সরকার আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের শর্ত পূরণে সহায়তা করবে।
আইএমএফের শর্তগুলোর মধ্যে একটি হলোÑ বাংলাদেশকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। এ ছাড়া পরবর্তী দুই অর্থবছরে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ করে এই অনুপাত বাড়াতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রাজস্ব বোর্ডকে আগামী তিন অর্থবছরে অতিরিক্ত ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার মদ, সিগারেট, গাড়ি এবং অস্ত্রসহ বিভিন্ন পণ্যকে শুল্ক হ্রাসের আওতায় আনার বিবেচনা থেকে বাদ দিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা, ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে প্রতি অর্থবছরে ট্যারিফ লাইনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে পরবর্তী তিন আর্থিক বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ ট্যারিফ লাইনে এসডি এবং আরডি পরিবর্তন করা।
তারা জানান, সরকার মূলত এসডি সংশোধনের চেষ্টা করছে। কারণ এসডির হার বেশি। অন্যদিকে আরডি নিয়ে এত চিন্তাভাবনার কিছু নেই। কারণ এটার হার সাধারণত ৩ শতাংশ হয়। আর এটা বছরের যেকোনো সময়েই পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু এসডি সব সময় পরিবর্তন করা যায় না।
তারা আরও জানান, এই পদক্ষেপটি অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং এফটিএ সইয়ের ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। এর ফলে বাণিজ্য বাধা দূর হবে। বিশ্ববাজারে আরও সহজে প্রবেশ করতে এবং প্রতিযোগিতা করতে এবং বিদেশি সরকারি ক্রয়ের জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়বে।
আঙ্কটাডের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি অবস্থা থেকে উন্নয়নশীল দেশে স্নাতক হওয়ার পর দেশটি বার্ষিক ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ বা ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মূল্যের রপ্তানি আয় হারাতে পারে।
এর কারণ টেক্সটাইল এবং পোশাক রপ্তানির ওপর দেশের অত্যধিক নির্ভরতা। এ ছাড়া দেশের রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সময় কঠিন প্রতিযোগিতা ও উচ্চ শুল্ক সহ্য করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে তিন বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। এতে দেশীয় শিল্পগুলো উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পরও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার জন্য সময় পাবে। স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকায় রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের পর তা আর পাবে না।’
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘দেশে বৈষম্যমূলক শুল্ক যেমনÑ উচ্চ এসডি, আমদানির জন্য আরডি, উৎপাদনের ক্ষেত্রে কম থাকলে চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অসুবিধার সম্মুখীন হবে। এমনকি সেক্ষেত্রে অন্যান্য দেশ তাদের ইচ্ছানুযায়ী শুল্ক আরোপ করতে পারে। এই পদক্ষেপটি বিদেশি এবং স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের রপ্তানি করতে উত্সাহিত করবে।’