আসিফ শওকত কল্লোল
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৩ ১৩:৩২ পিএম
আগামী বাজেটে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণে আসতে পারে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা। বিদেশ থেকে নতুন প্রযুক্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ছাড় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রস্তাবে বিষয়টি ছিল। ইতিমধ্যে অর্থ বিভাগ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে আমদানি শুল্ক কত ছাড় হবে সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
দেশের পণ্য বহুমুখীকরণের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের নীতি সহায়তা এবং বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন, গবেষণা এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় অনেক বছর ধরে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের প্রতিবেদনে এ বাধার বিষয়টি উঠে এসেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, দেশের মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এছাড়া চামড়া ও জুতা, ফার্মাসিউটিক্যালস-সিরামিকস, আইটি ও সফটওয়্যার, পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য, হস্তশিল্প, হিমায়িত খাদ্য, কৃষিভিত্তিকসহ আরও কয়েকটি খাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে পারে।
সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ট্রান্সফরমিং বাংলাদেশ পার্টিসিপেশন ইন ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল ভ্যালু চেইন' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ না হওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বে সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যে টেক্সটাইল পণ্যে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করছে, সেই পণ্যের ক্ষেত্রেও কোনো বৈচিত্র্য আনতে পারেনি দেশটি। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশ গতানুগতিক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করছে। এছাড়া বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে সেগুলোর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ (শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সরবরাহ চক্রের সম্পর্ক) খুবই দুর্বল। অধিকাংশ মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল অন্য দেশ থেকে আমদানি করে আনতে হয়। ফলে দেশের অভ্যন্তরে এসব পণ্যের মূল্য সংযোজন খুবই কম। তাই রপ্তানি কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থের জোগান বাড়াতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে না। পণ্যের বহুমুখীকরণ না হওয়ায় বাংলাদেশ ২০৩১ সালে যে উচ্চমধ্যম আয় ও ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মূল্য ব্যবস্থা (গ্লোবাল ভ্যালু চেইন) পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশে উচ্চ শুল্কহারের কারণে আমদানি ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। ফলে কোনো রপ্তানি পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে এর কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক দিতে হয়। এ কারণে উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে। যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
এ ব্যাপারে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ হচ্ছে নাÑ কারণ দক্ষ জনশক্তি, নতুন প্রযুক্তি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং নীতি সহায়তা, যেমন শুল্ক ছাড় সুবিধা নেই। তিনি বলেন, গার্মেন্ট কারখানা তৈরি করতে গেলে ১০ হাজার নারী কর্মী নিয়োগ দিলাম সেটা চালু হয়ে গেল, কিন্তু যখন আমি মোবাইল ইন্ডাস্টি করব অথবা সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ বানাব, তখন আমার দরকার দক্ষ জনশক্তি এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ।
প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আমাদের ব্যবসায়ীরা পণ্য বহুমূখীকরণে এত বড় বিনিয়োগ করার ক্ষমতা রাখে? সেমিকন্ডাক্টর এ দেশে উৎপাদন করতে হলে শুল্ক ছাড় প্রয়োজন রয়েছে। এটা হলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে।
এদিকে সম্প্রতি ঢাকা সফরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণে অবস্থা জানতে চেয়েছিল বাণিজ্য সচিবের কাছে। কারণ বাংলাদেশে একটি মাত্র রপ্তানি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এ থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে আস্তে আস্তে দেশের রপ্তানি কমে আসবে। এ বিষয়ে সচিব বলেছেন, অনেক বছর ধরে আইএমএফ বলে আসছে আমাদের মতো অল্প আইটেম রপ্তানির দেশে বহুমুখীকরণ করা অতি জরুরি। কারণ আমরা এলডিসি থেকে বেড়িয়ে আসছি।
বাণিজ্য সচিব জানিয়েছেন, সরকার রপ্তানিপ্রাপ্তিতে সরাসরি নগদ সহায়তার বিকল্প হিসেবে ১২টি খাতে প্রণোদনা প্রদান অব্যাহত রাখবে, যাতে রপ্তানিকারকদের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) পরবর্তী যুগে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়। এ ১২টি খাত হলোÑ গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যালস কাঁচামাল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, নন-লেদার পাদুকা, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স ও বৈদ্যুতিক পণ্য, প্লাস্টিক, জাহাজ নির্মাণ, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, মৎস্য ও পশুসম্পদ, সফটওয়্যার এবং আইটি-এনএবল।