× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাগরপাড়ের রুবিতে মজেছে ইউসিবি

জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৩ ০৮:২৬ এএম

আপডেট : ১১ মে ২০২৩ ১৫:৩৩ পিএম

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মাধ্যমে এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মাধ্যমে এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মাত্র ২৩ কোটি টাকার জামানতের বিপরীতে ৭৬৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বেসরকারি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল)। তার মধ্যেও সিংহভাগই দেওয়া হয়েছে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া। একাধিকবার ঋণ অনুমোদনের আগেই করা হয়েছে ঋণ বিতরণ। খেলাপি গ্রাহক হলেও ঋণ সুবিধা অব্যাহত রাখতে তাকে খেলাপি দেখানো হয়নি। উল্টো নতুন করে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আর এর সবই করা হয়েছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বিএসএম গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দিতে। ঋণের টাকায় গ্রুপটির ব্যবসার প্রসার ঘটলেও এখন আর ঋণ আদায় করতে পারছে না ইউসিবিএল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মাধ্যমে এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রুবি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ১ কোটি টাকা। কিন্তু পরিশোধিত মূলধন মাত্র ২ লাখ টাকা। কোনো ব্যাংকিং নিয়মাচারের তোয়াক্কা না করে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দুটি মেয়াদি ঋণ, তিনটি টাইম লোন, ৪টি ফোর্সড লোন, একটি ওভার ড্রাফ্ট ও একটি সিসি লোনের বিপরীতে ৬৬৪ কোটি ৯২ লাখ ২৯ হাজার টাকা দিয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা। এ ছাড়া নন-ফান্ডের বা এলসির মাধ্যমে ঋণ দিয়েছে ১০০ কোটি ৩২ লাখ। সব মিলিয়ে রুবি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৬৫ কোটি ৩৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া এসব ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০১৮ সালে জারি করা ‘গাইডলাইন অন ইন্টারনাল ক্রেডিট রেটিং সিস্টেম ফর ব্যাংকস’ অনুযায়ী রুবি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের অবস্থা ‘আনএক্সেপটেবল’ বা অগ্রহণযোগ্য। তার পরেও নীতিমালা লঙ্ঘন করে এই প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে ঋণ দেওয়া হয়েছে। পরিদর্শকদের মতে, গ্রাহক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফার সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছে। একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও গ্রাহক ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণের অর্থ পরিশোধ করছে না। গ্রাহকের নামে ফোর্সড লোন থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নতুন ঋণের অনুমোদন দিয়েছে। সুতরাং ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃক যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এ রকম গ্রাহকের অনুকূলে বারবার নতুন ঋণ সুবিধা প্রদান এবং বিদ্যমান ঋণ সুবিধা বর্ধিত ও নবায়ন করে আমানতকারীদের আমানতের অর্থ ঝুঁকিগ্রস্ত করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রুবি ফুড প্রোডাক্টসের অনুকূলে ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ ছয় বছর মেয়াদে ১৬৫ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করে ইউসিবিএল। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের কোনো সুযোগ নেই। যদিও ইউসিবিএল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিয়েছিল। আরও অবাক করা বিষয় হলো, ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিএসএম গ্রুপেরই আরেক প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন ট্রেডার্স থেকে স্থানীয়ভাবে মালামাল কেনার জন্য রুবি ফুডকে ৬০ কোটি টাকার একটি ঋণ মঞ্জুর করা হয়। কিন্তু ঋণটি বিতরণ করা হয়েছে ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর। অর্থাৎ ঋণ মঞ্জুরের চার দিন আগেই রুবি ফুড প্রোডাক্টসের কাছে পৌঁছে গেছে ঋণের টাকা। আর টাকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ইউসিবিএলের অ্যাকাউন্ট থেকে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখায় সম্পূর্ণ টাকা স্থানান্তর করে। এই ঋণ পরিশোধ না করায় চার দফা মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। ২৯ ডিসেম্বরই রুবি ফুড প্রোডাক্টসের নামে ৫৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার আরও একটি ঋণ মঞ্জুর করা হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, ঋণ মঞ্জুরের ১৪ দিন আগে অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ওই ঋণের টাকা জমা হয়ে গেছে। ওই টাকাও সঙ্গে সঙ্গে বিএসএম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হয়েছে, যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়Ñ ঋণ নিয়ে কোনো মালামাল কেনা হয়নি। এ ছাড়া তিন দফা এই ঋণের সময় বাড়ানো হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০১৯ ও ২০২০ সালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এই বিষয়গুলো নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল ব্যাংকটিকে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেখা গেছে তা আমলে নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

পরবর্তীকালে দুটি ইউপাস এলসির দায় পরিশোধের জন্য ২০২১ সালের ৯ ও ১১ মে দুটি ফোর্সড লোন তৈরি করা হয়। ঋণ দুটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা গ্রাহককে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেনি। বরং ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ঋণের মেয়াদ বাড়িয়েছে। ২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি ও ২ ফেব্রুয়ারি একই গ্রাহকের জন্য (ইউপাস এলসি) আরও চারটি ফোর্সড লোন তৈরি করা হয়। কিন্তু এসব লোনের সুনির্দিষ্ট কোনো অনুমোদন শাখা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দলকে দেখাতে পারেনি। পরিদর্শকদের মতে, শাখা ও প্রধান কার্যালয় থেকে গ্রাহকের ঋণগুলো খেলাপি না করেই পুনঃতফসিল করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিলের আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট জমা দিতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের অন্য অ্যাকাউন্ট থেকে এসব ঋণের ডাউন পেমেন্ট সমন্বয় করা হয়েছে। ডাউন পেমেন্টের এই টাকাও ছিল ইউসিবিএল থেকে নেওয়া ওভার ড্রাফট ঋণ। অর্থাৎ এক ঋণ দিয়ে অন্য ঋণের দায় পরিশোধ করেছে গ্রাহক। জানা সত্ত্বেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, করোনাকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মালামাল কেনার জন্য রুবি ফুডকে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় এক বছর মেয়াদে ৩০ কোটি টাকা ঋণ দেয় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল কেনার কথা ছিল তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক কোনো সম্পর্ক বা কাগজ দেখাতে পারেনি গ্রাহক। ঋণটি পরিশোধ না হওয়ায় আরও এক বছর ঋণের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বরভিত্তিক পরিদর্শন অনুযায়ী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে নেওয়া রুবি ফুড প্রোডাক্টসের ফান্ডেড ঋণের স্থিতি ৬৬৪ কোটি ৯২ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে সহায়ক জামানতের পরিমাণ মাত্র ২৩ কোটি ১৩ লাখ। অর্থাৎ এই ঋণগুলো ব্যক্তিগত জামানতনির্ভর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দলের মতে, গ্রাহকের অনুকূলে দেওয়া এসব ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 

সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ কাদেরির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তিনি জানান, প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং কোম্পানি সেক্রেটারি নিজেই যোগাযোগ করবেন। কিন্তু এ প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেননি। 

ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে গেলে জানানো হয়, এমডি স্যার দেশের বাইরে আছেন। পরে কোম্পানি সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে চাইলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করলে ঘণ্টাখানেক পর জানানো হয়, ওই বিভাগে কেউ নেই, যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। 

ব্যাংকটির কোম্পানি সেক্রেটারি এটিএম তাহমিদুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠানো হলেও জবাব মেলেনি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা