জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৩ ১৪:০০ পিএম
দেশে এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশের বেশি। তার পরও গত বছর পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য ডলার পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে দেশে ব্যবসা চলমান রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন অনেক ব্যবসায়ী। একই অবস্থা বিশ্বজুড়ে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা বিনিয়োগের হার কমেছে ৩৬ দশমিক ০২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নিট ৭০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে বাংলাদেশে। কিন্তু আগের প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল নিট ১১০ কোটি ডলার।
হিসাব অনুযায়ী, গত তিন মাসের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৩৬ দশমিক ০২ শতাংশ। তবে বাৎসরিক হিসাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সামষ্টিক বিনিয়োগ। কারণ ২০২২ সালে নিট ৩৪৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছে। কিন্তু ২০২১ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৮৯ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত চলমান ডলার সংকট এবং টাকার বড় দরপতনের কারণে তারা ধীরে চলা নীতি নিয়েছে। মহামারি করোনার ধাক্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ বিনিয়োগপ্রবাহ আগের অবস্থায় আসতে সময় লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিক বা তিন মাসে ৮৮ দশমিক ৮৪ কোটি ডলার, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৭৮ দশমিক ৭৪ কোটি ডলার, তৃতীয় প্রান্তিকে ১১০ কোটি ডলার ও চতুর্থ প্রান্তিকে ৭০ দশমিক ৩৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে দেশে। সুতরাং ২০২২ সালে মোট ৩৪৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। তবে ২০২১ সালের শেষ প্রান্তিক বা অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ১০৯ দশমিক ২১ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়।
বিদেশিরা যেমন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন, ঠিক তেমনভাবে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও বিদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। এখন পর্যন্ত বিদেশে বিনিয়োগের বৈধ অনুমোদন রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ২১টি প্রতিষ্ঠান দেশ থেকে সাত কোটি ৭০ হাজার ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগের অনুমোদন নিয়েছে। আর কারিগরি পরামর্শ ও অন্যান্য সেবার বিপরীতে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার দুটি কোম্পানিতে বড় অঙ্কের শেয়ার পেয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। অনুমোদন পাওয়াদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান চার কোটি ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৩৫ ডলার দেশের বাইরে নিয়েছে।
স্টিল খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) কেনিয়া ও হংকংয়ে প্রায় ৫২ লাখ ডলার বিনিয়োগের অনুমোদন পায়। ২০১৬ সালে কেনিয়ায় প্রায় ৪৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার বিনিয়োগ অনুমোদনের বিপরীতে এখন পর্যন্ত নিয়েছে মাত্র ২৭ হাজার ২০০ ডলার। অবশ্য হংকংয়ে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিনিয়োগের অনুমোদন পেলেও এখনও কোনো অর্থ নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, দেশের বাইরে বিনিয়োগের অনুমোদন পাওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের একটি অংশের বেশ আগ্রহ ছিল। গত বছর এ বিষয়ে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের আগে কিছু কোম্পানিকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদনও দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে অনুমোদন পাওয়া ১২টির মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানই দেশের বাইরে বিনিয়োগ করেনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু উৎপাদনের জন্যই দেশের বাইরে বিনিয়োগ নেওয়া হয়, তেমন নয়। ওষুধসহ কিছু ক্ষেত্রে পণ্য বাজারজাত করার সুবিধার জন্য বা সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে নামমাত্র বিনিয়োগ নিয়ে কোম্পানি খুলতে হয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত হলেও তখন ওই দেশে খোলা কোম্পানির নামে পণ্য বাজারজাত করা যায়। অবশ্য শুধু পণ্য বাজারজাত করার জন্য অনেক কোম্পানির বিদেশে শাখা বা লিয়াজোঁ অফিস রয়েছে। তৈরি পোশাক, ওষুধসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠান পণ্য বিপণনের সুবিধার্থে লোক নিয়োগ দিয়ে বিদেশে এ ধরনের অফিস পরিচালনা করে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এখন বিশ্ব অর্থনীতি একটা খারাপ সিচুয়েশনের মধ্যে আছে। কবে নাগাদ এ সমস্যার সমাধান হবে তা বলা যাচ্ছে না। অনিশ্চয়তার মেঘ এখনও ঘন। তাই আমার মতে অপেক্ষা করাটাই শ্রেয়। সংকটকালীন সময়গুলোতে বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনে রাখার চেষ্টা করেন, যাতে ক্ষতি কমিয়ে ন্যূনতম লাভ করা যায়। এখন ব্যবসায়ীরা হয়তো সে সুযোগটাই নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশ থেকে সরকারের অনুমতি নিয়ে বিদেশে যে বিনিয়োগটা হয়, তার পরিমাণটা খুব কম। তা ছাড়া অবাধ বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। বিদেশে বিনিয়োগের প্রক্রিয়াটা বেশ জটিল। বিদেশে বিনিয়োগ কমার বিষয়টি আমার কাছে বড় কোনো দুঃসংবাদ বলে মনে হয় না।