মামুন-অর-রশিদ
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৩ ০৮:৫২ এএম
আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:৩৫ পিএম
ভোলার ইলিশা-১ কূপ। ফাইল ফটো
ভোলার ইলিশা ঘিরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার আশা জেগেছে। ভূতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, ইলিশা-১ গ্যাসক্ষেত্রটি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ আরও বেশি গ্যাস মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইলিশা-১ খনন সফল হওয়ায় তারা এমন মনে করছেন। গত শুক্রবার ইলিশা-১ কূপে পরীক্ষামূলক গ্যাস উত্তোলন শুরু হওয়ায় এলাকাটি নিয়ে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। ইলিশাকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা দিলে এটি হবে দেশের ২৯তম গ্যাসক্ষেত্র।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইলিশা-১-এ যে ধরনের ভূ-গঠনে গ্যাস পাওয়া গেছে সেটি সম্পূর্ণ আলাদা। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে ইলিশার দূরত্ব ৩৫ থেকে ৩৮ কিলোমিটার। ভোলা নর্থ থেকে এর দূরত্ব ৬ থেকে ৮ কিলোমিটার। ইলিশার ভূ-গঠনের সঙ্গে ভোলা নর্থ ও শাহবাজপুরের একটি ফলট (চ্যুতি) রয়েছে। যেহেতু আলাদা ভূ-গঠন, তাই এটি নতুন একটি গ্যাসক্ষেত্র হতে পারে। তবে আরও দুটি পরীক্ষা (ড্রিল স্টিম টেস্ট) বাকি রয়েছে। এসব পরীক্ষা শেষ হলেই এটি নতুন ক্ষেত্র কি না সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাবে বাপেক্স। সব পরীক্ষা শেষ করে আগামী ১৫ মে নাগাদ এই ঘোষণা আসতে পারে বলে মনে করছেন মোহাম্মদ আলি। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ইতোমধ্যেই ফেসবুকে লিখেছেন, আরও একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ।
বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, ভূ-গঠন যদি পৃথক হয় তাহলে সেটি পৃথক গ্যাসক্ষেত্র হতে পারে। তবে পরিস্থিতি যাই হোক, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আরও গ্যাস থাকতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান ভূতাত্ত্বিক অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর বলেন, ভোলার গ্যাস আমাদের নতুন আশা জাগাচ্ছে। এটি একটি নতুন ক্ষেত্র কি না সেই ঘোষণা একমাত্র বাপেক্সই দিতে পারে। নতুন ক্ষেত্র হলে সেটি অবশ্যই আশার খবর। তবে ইলিশায় গ্যাস পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে ভোলা গ্যাসক্ষেত্রটি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে কূপ খনন করলে আরও গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, আগে মনে করা হতো উত্তর ও পূর্বাঞ্চল থেকে যত দক্ষিণে যাওয়া হবে ততই খনি পাওয়ার সম্ভাবনা কমবে। এখন সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
ইলিশায় গত ১৪ এপ্রিল ৩ হাজার ৪৭৫ মিটার গভীরে খননকাজ সম্পন্ন করা হয়। কূপটির তিনটি স্তরে পরীক্ষা (ড্রিল স্টেম টেস্ট) করার পরিকল্পনা করে বাপেক্স। এর মধ্যে গত ২৮ এপ্রিল ৩ হাজার ৪৩২ মিটার থেকে ৩ হাজার ৪৩৫ মিটার গভীরতায় ৩ মিটার ইন্টারভেলে পারফোরেশনের মাধ্যমে প্রথম পরীক্ষা করা হয়। বাপেক্স বলছে, চোক সাইজ ক্রমান্বয়ে ২০/৬৪ থেকে ৩২/৬৪ পর্যন্ত বৃদ্ধির মাধ্যমে ওই স্তরে গ্যাস উৎপাদন হতে দেখা যায়। সর্বশেষ গ্যাস জোনে ২০/৬৪ চোক সাইজে ৩ হাজার ৩৪৫ পিএসআই প্রেশারে গড়ে ৯ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ফ্লো দেখা গেছে। গতকাল শনিবার নাগাদ যা ১৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়েছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলি বলছেন, ‘যে স্তরে গ্যাস মিলেছে সেখানে গ্যাসের চাপ অনেক ভালো। অন্য দুটি স্তরে গ্যাসের চাপ দেখেই আমরা বলতে পারব প্রকৃত অবস্থা কী।’ জ্বালানি বিভাগের তথ্য মোতাবেক, ২০২২-২৪ বছরে পেট্রোবাংলা মোট ৪৬টি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে বাপেক্সের তত্ত্বাবধানে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম টবগি-১, ভোলা নর্থ-২-এ কূপ খনন ও গ্যাস আবিষ্কার করে। গত ৯ মার্চ প্রকল্পের তৃতীয় কূপ ইলিশা-১-এ খননকাজ শুরু হয় আর পরীক্ষামূলক উত্তোলন শুরু হয় ২৮ এপ্রিল।
ভোলায় নব্বই দশকে প্রথম গ্যাস মেলে। কিন্তু এতদিন বাপেক্স সেখানে অনুসন্ধানে জোর দেয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাপেক্স বেশি নজর দেয়। ইলিশা-১ কূপে ১৮০ থেকে ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা দেখছে বাপেক্স। তাদের ধারণা অনুযায়ী, দৈনিক এই কূপ থেকে ২০ থেকে ২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। পরীক্ষা শেষে আগামী ১৫ মে নাগাদ এসব তথ্য নিশ্চিত হবে বাপেক্স। সব ঠিক থাকলে তখন বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে তাদের। এ ছাড়া ভোলার শাহবাজপুর ও ভোলা নর্থ নামের আলাদা দুটি গ্যাসক্ষেত্রের ৯টি কূপে মজুদের পরিমাণ ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বলে নিশ্চিত করেছে বাপেক্স।
১৯৯৪-৯৫ সালে ভোলায় প্রথম গ্যাসের সন্ধান মেলে। দেশে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৫ সালে সিলেটের হরিপুরে। এখন দেশে ২৮টি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। ইলিশাকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র ঘোষণা দিলে এটি হবে দেশের ২৯তম গ্যাসক্ষেত্র। একের পর এক গ্যাসের সন্ধান মেলায় নতুন করে সম্ভাবনা দেখছে ভোলাবাসী। দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে দূরে গ্যাস সরবরাহ ব্যয়বহুল হওয়ায় ভোলাতেই শিল্পকারখানা গড়ে তোলার চিন্তা করছে সরকার।