হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৩ ১৭:৫২ পিএম
বন্ড সুবিধায় পণ্য এনে সেগুলো খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। কাস্টমস বন্ড কর্মকর্তাদের তদারকির পরও থামছে না বন্ড সুবিধার এই অপব্যবহার। তাদের নজরদারি এড়িয়ে অহরহ ঘটছে খোলাবাজারে বন্ড সুবিধার পণ্য বিক্রি। কাস্টমস বন্ড কর্মকর্তারা বলছেন, বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের কারণে প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫টি চালান আটক করছেন। কিন্তু তাতেও খোলাবাজারে বন্ড সুবিধার পণ্য বিক্রি কমছে না।
বন্ডেড সুবিধা বলতে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শুল্ক-কর পরিশোধ ছাড়া কাঁচামাল এবং প্যাকিংসামগ্রী আমদানির সুবিধা প্রদানকে বোঝায়। তাই নিয়ম অনুযায়ী বন্ডেড সুবিধায় কাপড় এনে সেগুলো দিয়ে পোশাক তৈরির পর রপ্তানি করতে হয়, খোলাবাজারে বিক্রির সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি খোলাবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা এলাকার একটি গোডাউন থেকে কাভার্ড ভ্যানে করে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বন্ডেড সুবিধায় আনা কাপড়। গোপন সংবাদ থাকায় চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকা থেকে কাপড়ভর্তি ওই কাভার্ড ভ্যানটি আটক করেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। পরে তাতে তল্লাশি চালিয়ে সাদা, হলুদ, জলপাই, হালকা বেগুনিসহ ৭/৮টি ভিন্ন ভিন্ন রঙের নিট ফেব্রিক্সের ১২৮ রোলের বস্তা এবং ২২৮টি কাপড়ের রোল পাওয়া যায়। এ ঘটনায় কাপড়গুলোর মালিক টেরিবাজারের ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে এজাহারনামীয় আসামি করে মামলা করেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. এমরানুল হক। মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রধান দুই আসামি নজরুল ইসলাম ও মো. দ্বীন ইসলাম বর্তমানে কারাগারে।
অভিযোগ রয়েছে, এই দুই আসামি ঢাকার সদরঘাট এলাকার ব্যবসায়ী আইয়ুব খানের সঙ্গে যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধার পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছেন। চক্রটি বন্ড সুবিধার পণ্য অবৈধ মজুদ, সরবরাহ ও খোলাবাজারে বিক্রি করে শুল্ক-কর ফাঁকি, দেশীয় শিল্পের ক্ষতিসাধন এবং দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে চলেছেন। সর্বশেষ গত ২২ ফেব্রুয়ারির চালানটি তারা কাস্টমস থেকে নিলামে কেনা কাপড়ের চালানের বিপরীতে পাচার করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আইয়ুব খান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নজরুল ইসলামের কাছে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন। ওই টাকা না দেওয়ায় চালানটি আটক করেছে।’
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যুগ্ম কমিশনার সাইফুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নিলামের কাগজপত্র ব্যবহার করে তারা দীর্ঘদিন বন্ডের কাপড় পাচার করে আসছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর চালানটি আটক করেছি। জব্দ কাপড়গুলোর বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি বলেই আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।’
এর আগে গত জানুয়ারি মাসে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের ঘটনায় গোলটেক্স গার্মেন্টসের আমদানি করা চারটি চালানে ১০৮ দশমিক ৪৭ টন ফেব্রিক্স জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। চারটি চালানে থাকা কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ছিল ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। যে কাপড়গুলোর বাজারমূল্য ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
শুধু এ ঘটনাটি নয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে ২৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রিভেন্টিভ মামলা দায়ের করে কাস্টমস বন্ড কমিনারেট কার্যালয়। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৯টি প্রিভেন্টিভ মামলার বিপরীতে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করা হয়। এই ২৯ মামলায় জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে জুলাই মাসে ১০টি মামলা করা হয়। আগস্ট মাসে ৮টি, সেপ্টেম্বর মাসে ৫টি, অক্টোবর মাসে ২টি, নভেম্বর মাসে ১টি এবং ডিসেম্বর মাসে ৩টি মামলা করা হয়। ২৯টি মামলার মধ্যে ২৭টি মামলা ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। মেসার্স সায়েম ট্রেডার্স এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও মেসার্স তাজ এক্সেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের দায়ের করা দুটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। ২৯টি মামলার বিপরীতে যেসব পণ্য জব্দ করা হয়েছিল ওই সব পণ্যের মধ্যে ফ্রেবিক্স, বিওপিপি ফিল্ম, পিপি দানা, ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট কার্ড ও কাগজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস বন্ড কর্মকর্তারা।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কার্যালয়ের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫টি চালান আমরা আটক করছি। জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বন্ডেড লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে। কিন্তু তাতেও বন্ডেড সুবিধার পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি থামছে না।’
চলতি অর্থবছরে কয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ২৯টি প্রিভেন্টিভ মামলা করা হয়। এরপর থেকে গত চার মাসে আরও অন্তত ১৫ থেকে ১৬টি প্রিভেন্টিভ মামলা দায়ের করা হয়েছে।