আনিছুর রহমান
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৩ ১২:৫৪ পিএম
আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:২৩ পিএম
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সাধারণ সম্পাদক ফার সিরামিকের পরিচালক ইরফান উদ্দিন। প্রবা ফটো
ফার সিরামিকের পরিচালক ইরফান উদ্দিন বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। চলতি মেয়াদসহ তিন মেয়াদে এই পদে আছেন সিরামিক খাতের এ উদ্যোক্তা। সম্প্রতি তিনি দেশের সিরামিক খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিছুর রহমান।
বর্তমানে সিরামিক খাতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা দেখছেন?
ইরফান উদ্দিন: বর্তমানে সিরামিক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রাকৃতিক গ্যাস। কারণ এই খাত পুরোটাই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গত এক বছরে গ্যাসের দাম অনেকটা হঠাৎ করেই বেড়েছে। ২০২২ সালে একবার ২০ শতাংশের কাছাকাছি বেড়েছিল। চলতি বছর জানুয়ারিতে আবারও ১৬৫ শতাংশ দাম বেড়েছে। তার মানে গত এক বছরে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশের কাছাকাছি। এদিকে ডলারের দাম বাড়ায় ২৫-৩০ শতাংশ বাড়তি খরচে কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। বাড়তি খরচটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ডলার-সংকটে কাঁচামাল আমদানিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে?
ইরফান উদ্দিন: সিরামিক খাতের কাঁচামাল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। সেক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে টেবিলওয়্যার যেহেতু রপ্তানিনির্ভর পণ্য, তাই তারা কাঁচামাল আমদানিতে খুব একটা সমস্যায় পড়ছে না। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো পুরোপুরি সহায়তা করতে পারছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
তবে ব্যয় বাড়লেও সিরামিক প্রতিষ্ঠানগুলো হঠাৎ করে পণ্যের দাম ২০-৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারছে না। কারণ সিরামিক পণ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য না যে মানুষকে কিনতেই হবে। আর বিদেশি ক্রেতাদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কিন্তু পণ্যের দাম অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়াতে না পারলে মুনাফা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
গ্যাসের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে?
ইরফান উদ্দিন: দিনের নির্দিষ্ট সময় কারখানাগুলো চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছে না। মেশিনগুলো চালাতে গ্যাসে কমপক্ষে ১০ পিএসআই চাপ লাগে। কিন্তু সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ পিএসআই চাপ। তবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত বছর ১২-১৩ ঘণ্টা গ্যাসের চাপ কম থাকত এখন সেটা ২-৩ ঘণ্টায় নেমেছে। নির্দিষ্ট ফ্লোতে গ্যাস না পেলে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে।
সিরামিক পণ্যে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
ইরফান উদ্দিন: দেশেই সিরামিক পণ্যের বাজার ১২-১৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারও আমাদের জন্য খোলা। সারা বিশ্বেই এই পণ্যের চাহিদা রয়েছে। তাই দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশে বাজার সম্প্রসারণ করতে পারলে এ খাতের সম্ভাবনা অনেক।
এ খাতের কোন কোন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে?
ইরফান উদ্দিন: সিরামিক পণ্যের রপ্তানির সিংহভাগই হচ্ছে টেবিলওয়্যার। কিছুদিন থেকে বিভিন্ন দেশে টাইলস রপ্তানি শুরু হয়েছে। কোম্পানিগুলো নিজেরাই বাজার খুঁজে অল্প অল্প করে পণ্য বিদেশে পাঠাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার বিস্তৃত করতে কোম্পানিগুলো নিজেরা এবং অ্যাসোসিয়েশন কাজ করছে।
সিরামিকের স্থানীয় চাহিদার কত শতাংশ আমদানিনির্ভর?
ইরফান উদ্দিন: এখনও ১৫-২০ শতাংশ সিরামিক পণ্য বিদেশ থেকে আসে। যদিও মানের দিক থেকে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক মানের। বাংলাদেশ পণ্য উৎপাদনে ইউরোপের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যারা নতুন করে বিনিয়োগ করছে তারা সবাই আধুনিক প্রযুক্তিই নিয়ে আসছেন। দেশে এখন ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী টাইলস বানানো হচ্ছে। আগে যেখানে ছোট ছোট টাইলস বানানো হতো এখন সেখানে ৩-৬ ফুট আকারের টাইসল বানাচ্ছে। যাতে থাকছে আধুনিক ডিজাইন। আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে একটুও পিছিয়ে নেই দেশের সিরামিক খাত।
উদ্যোক্তারা কি আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজছেন?
ইরফান উদ্দিন: স্থানীয় চাহিদা মেটাতে এখনও সিরামিক পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। তার মানে চাহিদা জোগানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি বাজার খুঁজতেও বড় বিনিয়োগ লাগে। একটা বিদেশি এক্স-পোতে অংশ নিতে অন্তত ১০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। বিদেশে বিক্রির জন্য নতুন মানবসম্পদ লাগে। তাই এ মূহূর্তে স্থানীয় চাহিদা মেটাতেই কাজ করছে সিরামিক কোম্পানি। যেহেতু প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিনিয়োগ ঢুকছে। ফলে সামনে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তখন স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারও খুঁজতে হবে। অ্যাসোসিয়েশনের পাশাপাশি কোনো কোনো কোম্পানি নিজ উদ্যোগে বৈশ্বিক বাজার তৈরির চেষ্টা করছে।
আমদানি করা কাঁচামালে কত শতাংশ ‘ভ্যালু’ যোগ করছেন?
ইরফান উদ্দিন: টেবিলওয়্যারের ক্ষেত্রে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর প্রায় ৪০০ শতাংশ ভ্যালু যোগ করি। কারণ টেবিলওয়্যার শৌখিন পণ্য। এখানে মাটি থেকে অনেক আকর্ষণীয় ডিজাইনের পণ্য তৈরি করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে টাইলসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ ভ্যালু যোগ করা হয়।
সিরামিক খাতের মানবসম্পদ কি পর্যাপ্ত আছে?
ইরফান উদ্দিন: দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে। খাতটি যেভাবে বড় হচ্ছে সেভাবে মানবসম্পদকে দক্ষ করে তোলা যায়নি। তাই নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা হলে পুরোনো কোম্পানি থেকে লোক নিয়োগ করে। কারণ কর্মরতদের বাইরে তেমন একটা অভিজ্ঞ কর্মী নেই। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে এই জায়গায় উন্নতি করা যায়। সরকারের মাস্টার স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটির অধীনে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ স্কিল কাউন্সিল কাজ করছে। সিরামিক আইএসসি অধীনে ১ হাজার ২০০ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আরও প্রকল্প আছে, অর্থায়ন পেলেই কাজ শুরু করা হবে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে ২০ হাজার দক্ষ মানুষ তৈরি করতে না পারলে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় বা ইনস্টিটিউট থেকে কেমন মানবসম্পদ পাচ্ছেন?
ইরফান উদ্দিন: যে ধরনের মানবসম্পদ পাওয়া যাচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। দেশের একমাত্র গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তি সেকেলে। ওই শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে অন্তত ১৫ বছর এগিয়ে আছে দেশীয় সিরামিক কোম্পানিগুলো। এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানে অনেকটাই পিছিয়ে। এজন্য গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করছি।
বাজেটে সিরামিক খাত নিয়ে প্রস্তাব কী কী?
ইরফান উদ্দিন: কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক অনেক বেশি। এটা যেহেতু শুধু ম্যানুফেকচারিংয়ের জন্য আমদানি করা এবং এখানেই ব্যবহার হয়। সুতরাং এর ওপর সব ধরনের শুল্ক কমানো উচিত। আর আমদানি করা ফিনিসড সিরামিক পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ক আরোপেরও প্রস্তাব দিয়েছি এনবিআরকে। সেই সঙ্গে উৎপাদক পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি।