আনিছুর রহমান
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৩ ১২:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:১৮ পিএম
দেশের পুঁজিবাজারে সিরামিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা পাঁচটি। এসব কোম্পানির সবশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চারটি কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কমে গেছে। এর মধ্যে একটি বড় ধরনের লোকসান করছে। বিদেশি কোম্পানি আরএকে সিরামিক্স বাদে সব কয়টি জুন ক্লোজিং কোম্পানি। ফলে এর মধ্যে চলতি হিসাব বছরের ছয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে চারটি কোম্পানি। আর চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ করেছে আরএকে সিরামিক্স।
এ কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, টেবিলওয়্যার তৈরি প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর সিরামিক্সের মুনাফা আগের বছরের চেয়ে খানিকটা বেড়েছে। বাকি তিন কোম্পানির মুনাফা আগের বছরের চেয়ে কমেছে। আর একটির লোকসান আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। গত ৩-৪ বছরে আর্থিকভাবে দুর্বল হচ্ছে এ খাতের তালিকাভুক্ত সিংহভাগ কোম্পানি। যদিও গত এক দশকে এ খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ এসেছে, এখনও আসছে।
ফু-ওয়াং সিরামিক : ১৯৯৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সিরামিক খাতের কোম্পানি ফু-ওয়াং সিরামিক। গত চার বছরে টানা মুনাফা কমেছে টাইলস উৎপাদনকারী সিরামিক খাতের এই কোম্পানির। চলতি হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২২) প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ১২ পয়সায়; যা আগের বছর ছিল ১৭ পয়সা। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে মুনাফা কমেছে ২৭ শতাংশের ওপর। বর্তমানে ডিএসইতে শেয়ারটি ফ্লোর প্রাইস ১৭ টাকা ৪০ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে।
আরএকে সিরামিক্স : বহুজাতিক কোম্পানি আরএকে সিরামিক্সের হিসাব বছর শেষ হয় গত ৩১ ডিসেম্বর। তাই চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ, ২০২৩) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, আরএকে সিরামিক্স এ সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৩৭ পয়সা; যা আগের বছর ওই সময় ছিল ৫৭ পয়সা। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, এ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ আয় করেছে আরএকে সিরামিক্স। যদিও শেয়ারের দামে নিচের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে আছে কোম্পানি। ২০১০ সালে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি।
শাইনপুকুর সিরামিক্স : ২০০৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় শাইনপুকুর সিরামিক্স। ২০২০ সালের আগে টানা কয়েক বছর লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থ হওয়ায় দুর্বল কোম্পানিগুলোর গ্রুপ জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছিল। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কোম্পানিটি। বর্তমানে বি ক্যাটাগরিতে অবস্থান করা শাইনপুকুর সিরামিক্স চলতি হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২২) শেয়ারপ্রতি আয় করেছে ২৫ পয়সা; যা আগের বছর ছিল ১০ পয়সা। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে মুনাফা বেড়েছে ১৫০ শতাংশ। সবশেষ ডিএসইতে শেয়ারটি লেনদেন হয়েছে ৪৫ টাকায়।
মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ : সিরামিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন কোম্পানি মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৯৮৩ সালে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়। ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে কোম্পানির আয় টানা বাড়লেও চলতি হিসাব বছরে আয় অনেকটা কমে গেছে। হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২২) শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ১৫ পয়সা; যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৬৪ পয়সা। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে মুনাফা কমেছে ৫০ পয়সা বা ৭৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বর্তমানে শেয়ারটি ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে একটু ওপরে ১০৩ টাকা ৪০ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে।
স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ : ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সিরামিক খাতের কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ। গত চার বছরের মধ্যে ২০২১ সালে সামান্য মুনাফা করলেও পরের বছরগুলোতে লোকসান করেছে স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২২) কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ৩৩ পয়সা। আগের বছর একই সময়ে লোকসান ছিল ২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে লোকসান প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বড় লোকসান করেই দামের দিক থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে আছে স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ। বর্তমানে ডিএসইতে তা ১১২ টাকা ৬০ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে।
শেয়ারপ্রতি আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে মূল্য সংবেদনশীল তথ্যে বেশিরভাগ কোম্পানিই গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সরবরাহ কমে যাওয়া, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির ফলে কাঁচামাল ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধিকে এবং বিক্রয় কমে যাওয়াকে উল্লেখ করেছে।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইরফান উদ্দিনও। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে তিনটি টেবিলওয়্যার ও দুটি টাইলস তৈরি করে। কাঁচামালসহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় সিরামিক পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ফলে বিক্রি অনেকাংশে কমে গেছে; যা মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ সিরামিক পণ্য অনেকটা শৌখিন পণ্য। কোভিড-পরবর্তী সময়ে কোম্পানিগুলো খারাপ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার মাঝেই অর্থনৈতিক সংকট নতুন করে সমস্যায় ফেলেছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের।