দাম নির্ধারণে শুভংকরের ফাঁকি
সোহেল চৌধুরী
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৩ ০৮:৪৪ এএম
আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৩ ১১:০৫ এএম
প্রতীকী ছবি
মুরগির বাচ্চা ও খাবারের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বারবার অস্বীকার করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। অবশেষে সরকারের চাপে দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে তারা। তবে নতুন প্রক্রিয়াতেও আছে গলদ। দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় থাকছেন প্রাণিসম্পদের কতিপয় কর্মকর্তা ও করপোরেট সিন্ডিকেটের প্রতিনিধিরা। যুক্ত করা হচ্ছে না প্রান্তিক খামারিদের। সম্প্রতি দাম নির্ধারণ নিয়ে বৈঠকে বিনা আমন্ত্রণে প্রান্তিক খামারিদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হলেও তাদের কথা বলার সুযোগ দেয়নি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। বিশ্লেষকরা বলছেন, করপোরেট প্রতিনিধিদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হলে সিন্ডিকেটের কবলেই থেকে যাবে মুরগির বাজার।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় মুরগির বাচ্চা ও ফিডের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. এমদাদুল হক তালুকদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মুরগির বাচ্চা ও ফিডের দাম আর নিজেদের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করতে পারবে না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এখন থেকে এটা যাচাই-বাছাই করবে। উৎপাদন খরচ কত হচ্ছে, দাম কত হওয়া উচিতÑ এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হবে; যা বাস্তবায়ন হবে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই।’ তবে কেন প্রান্তিক খামারিদের যুক্ত করা হয়নি তার কোনো সদুত্তর দেননি তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুরগি উৎপাদনে প্রান্তিক খামারিরা ৮০ ভাগ ভূমিকা রাখলেও সরকারি কোনো সংস্থার বৈঠকে প্রান্তিক খামারিদের মতামত বা অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না। দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে গত ১৭ এপ্রিল বৈঠক হলেও এখানে ছিল না প্রান্তিক খামারিদের কেউ। এমনকি আমি ওই বৈঠকে থাকলেও আমার মতামত নেওয়া হয়নি। আমি ওই মিটিংয়ে থাকলেও লিখিত কোনো আমন্ত্রণ পাইনি। আমি কথা বলতে চাইলেও তারা আমাকে সুযোগ দেয়নি।’
দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রাণিসম্পদের স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলে সুমন হাওলাদার বলেন, এসব মিটিং খাতা-কলমেই থেকে যায়; যা বাস্তবায়ন হয় না। প্রাণিসম্পদ গুরুত্ব দেয় করপোরেট কোম্পানিগুলোকে। তাদের যোগসাজশেই সুযোগ নেয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। মুরগির বাচ্চা ও ফিডের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া কোনোভাবেই করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতামতের ভিত্তিতে হতে পারে না। এ জন্য দরকার পোল্ট্রি বোর্ড গঠন। এই বোর্ড গঠন করা হলে আসবে স্বচ্ছতা। প্রাণিসম্পদ সব সময়েই করপোরেটদের সুযোগ দিয়ে আসছে ভবিষ্যতেও দেবে।
এই দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যদি করপোরেট প্রতিষ্ঠানেরই মত নিয়ে থাকে, তবে তা কখনোই প্রান্তিক খামারি বা ভোক্তাদের পক্ষে যাবে না বলে দাবি করেন বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি, এতে প্রাণিসম্পদের অনুকূলেই যাবে সব সিদ্ধান্ত। সংকট নিরসনে দরকার কমিটি গঠন।
এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) বাজার বিশ্লেষক ও ভোক্তা কণ্ঠের সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান বলেন, ‘মুরগির বাজার যে এতটা অস্থির হয়েছে, এখানে নীরব ভূমিকা পালন করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এখন দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যদি শুধু করপোরেট ব্যবসায়ীদেরই মতামত নেওয়া হয়, তবে তা কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। এতে বরাবরই ক্ষতির মুখে পড়বে প্রান্তিক খামারি ও ভোক্তারা। তাই দরকার শক্তিশালী কমিটি।’
বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা কেজি দরে। আর এই ২৬০ টাকা কেজি দরে মুরগি বিক্রির পেছনের প্রধান কারণ মুরগির বাচ্চা ও ফিডের উচ্চ দর। সূত্র বলছে, ২৬০ টাকা দরের মুরগির প্রতিটি বাচ্চার দাম ছিল ৯০ টাকা। আর প্রতি বস্তা ফিডের দাম ছিল ৩ হাজার ৭৫০ টাকা। গত কয়েক দিন ধরে মুরগির বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা দরে। এর পেছনের কারণ হিসেবে পাওয়া যায় বর্তমানে প্রান্তিক খামারিরা বন্ধ রেখেছেন মুরগি উৎপাদন। এতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাচ্চা বিক্রি করতে না পেরে কমিয়েছে দাম। সূত্র বলছে, প্রান্তিক খামারিরা পুরোদমে উৎপাদনে গেলেই বাচ্চার দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ফিড উৎপাদনের কাঁচামালের খরচ কেজিতে ১৪ টাকা কমলেও প্রতি বস্তা ফিড আগের দরেই অর্থাৎ ৩ হাজার ৭৫০ দরে বিক্রি হচ্ছে।