মজুমদার বাবু
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:২৮ পিএম
আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:৩৮ পিএম
সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ। প্রবা ফটো
সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ এক গবেষণায় দেখেছেন, দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় চালিকাশক্তি হলো উৎসব। রোজা ও ঈদ মিলে এত বড় ধর্মীয় উৎসব আর নেই। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছে, বহু মানুষকে যুক্ত করে এই উৎসব। আর্থিক দৈন্য ও সীমাবদ্ধতার নিরানন্দ জীবনে উৎসব ও পালা-পার্বণই এখানে জ্বালিয়ে রেখেছে আশা ও আনন্দের দীপ্ত শিখা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মজুমদার বাবু
উৎসবের অর্থনীতির আকার কি বেড়েছে?
মামুন রশীদ : উৎসবের অর্থনীতির দুটো দিক। রোজা আমাদের দেশে একটি বড় উৎসব। রোজা ও ঈদ মিলে এত বড় ধর্মীয় উৎসব আর নেই। বহু মানুষকে যুক্ত করে এই উৎসব। প্রায় ১২ বছর আগে আমরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা জরিপ করেছিলাম। সেখানে ছিল-কত লোক রোজা রাখে, রোজার সময় কী খায়, একজন নিম্ন আয়ের মানুষের ইফতারে কী থাকে এবং সেটা কেনার জন্য তার কত লাগে। আর সর্বোচ্চ স্টার হোটেলগুলোতে কী পরিমাণ খরচ হয়। তখন আমরা গ্রামের কৃষক, মফস্বলের একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং চাকরিজীবী; মেট্রোপলিটনের চাকরিজীবী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সবাইকে নিয়েই জরিপটি করেছিলাম। হিসাব কষে দেখেছিলাম এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ৬৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু ১২ বছর পর দেখেছি মূল্যস্ফীতির অনুপাতে উৎসবের অর্থনীতি সে অর্থে বাড়েনি।
বর্তমানে ইফতারকেন্দ্রিক খরচে কেমন পরিবর্তন এসেছে?
মামুন রশীদ : আমরা ২০১২ সাল গড় করে দেখেছিলাম ২০ টাকা লাগে ইফতারে। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি গড়টা বেড়ে ৪০ টাকার মতো হয়েছে। প্রশ্ন থাকতে পারে দ্রব্যমূল্যের ঊধ্বর্গতি ২৫ শতাংশ। চাল, ডাল, ছোলা, বেসন, চিনি এগুলোর দাম এক বছরে ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সালে সালে যদি ২০ টাকা থাকে তাহলে ২০২৩ সালে কেন ৪০ টাকা হবে? কারণ হচ্ছে মানুষ খাদ্য তালিকায় কাটছাঁট করছে। আগে মানুষ সেহরিতে গরুর মাংস খেত। এখন তা আর দেখা যায় না। সম্প্রতি আমরা খুব একটা গভীর জরিপ করতে পেরেছি তা নয়। সানেমের স্টাডি, সিপিডির স্টাডিÑ এগুলো থেকে টার্গেট মার্কেটটাকে ভাগ করেছি। তারা যদি ১ হাজার ৫০০ মানুষকে জরিপ করে থাকে তার মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষ কতজন? অতি দরিদ্র কতজন? ওইটাকে পৃথক করে দেখেছি গড়ে ২০ টাকা খরচ করছে কেউ আবার কেউ করছে ৮ হাজার ৪০০ টাকা। এখানে আমরা দেখেছি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। ওপরের পর্যায়ে খুব একটা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন দেখছি না আমরা। শুধু ষাটোর্ধ্বদের মধ্যে একটা ফলফলাদি খাবার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা ভাজাপোড়ার বিষয়ে বেশ সতর্ক হয়েছেন। তাদের খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন।
আরেকটা দেখেছি, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সিদের প্রায় ৫০ ভাগ লোক রোজা রাখছে। আর তাদের প্রায় সম্পূর্ণ ১৬ কোটি ৯৮ লাখের ৯০ শতাংশ ইফতার করে। গড়ে ৪০ টাকা হিসেবে তারা দৈনিক ইফতার খাচ্ছেন ৬৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং মাসে ২০ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকার।
ভ্রমণকেন্দ্রিক খরচে কেমন পরিবর্তন এসেছে বলে আপনি মনে করেন?
মামুন রশীদ : আমরা দেখেছি, মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে প্রায় ১ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ করছে ঈদ উপলক্ষে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা গেলে গড় ১ হাজার টাকা হিসাব করছে। সে হিসাবে ১ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ খরচ হয়। ২ লাখের বেশি মানুষ ঈদ উপলক্ষে বিদেশে ভ্রমণ করছে। যাদের গড় খরচ ২ হাজার ডলার। সে হিসাবে ৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা খরচ করছে। আর ৫ লাখ মানুষ রোজার শপিং, ওমরাহ, থাইল্যান্ডে চিকিৎসা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছে। তারা গড়ে ২ হাজার ডলার খরচ করছে। সে হিসাবে ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আরও ২ লাখ মানুষ গড়ে খরচ করছে ৫ হাজার ডলার। সে হিসাবে তারাও ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচ করছে।
বেতন বোনাস বকশিশ ও কেনাকাটায় কেমন পরিবর্তন এসেছে?
মামুন রশীদ : আমরা ১২ বছর আগে দেখেছি, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়, যা ২৫ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। ১২ বছর আগে ঈদে ১ কোটি মানুষকে বোনাস, বকশিশ ইত্যাদির গড় ছিল ১০ হাজার টাকা, যা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। সে হিসাবে খরচ হচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। ঈদ প্রায় ৬ কোটি মানুষকে প্রভাবিত করছে। বলে রাখা ভালো, অনেকের অনুরোধে আমি এই জরিপটিকে আপডেট করেছি। এটা সঠিক গবেষণাপ্রসূত নয়। ১২ বছর আগে গবেষণায় যারা সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের সবাইকে এখন আমরা সময়ের বিবর্তনে পাচ্ছি না। পরোক্ষ জরিপে আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, বণিক সমিতি, সানেম ও সিপিডির জরিপকারী রয়েছেন।
ঈদে সবচেয়ে বেশি খরচ করছে কারা?
মামুন রশীদ : বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ঈদে খরচ করে মধ্যবিত্ত। উচ্চবিত্তদের ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটা কম। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না থাকলে তারা হয়তো গ্রামেও যায় না। একটা ইতিবাচক দিক হচ্ছে, কোভিডকালে যারা কেনাকাটা করতে পারেনি তাদের একটা স্পিড আছে এবারের কেনাকাটায়। সেকেন্ডারি ডেটা বেশি পর্যালোচনা করতে হয়েছে।