মৌলভীবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৩৯ এএম
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:৩১ পিএম
ছত্রাকজনিত ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত বোরোক্ষেতের পাশে দিশেহারা কৃষক। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে ধানে ছত্রাকজনিত ‘ব্লাস্ট’ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বোরো মৌসুমে ধান পাকার শুরুতেই ব্লাস্ট সংক্রমণে আধাপাকা ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। ধানের ফলনের এ বিপর্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক।
হাওরাঞ্চলে যখন বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মহোৎসব হওয়ার কথা, তখন অনেকটা সুনসান নীরবতা। মাঠের ধান খাচ্ছে গবাদিপশু। কোনো কোনো এলাকায় ধান কেটে কৃষকরা ফেলে দিচ্ছেন ছড়া-খাল-বিলের পানিতে।
জেলার কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওর, সদর উপজেলার কাউয়াদিঘি হাওর এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওরে ছড়িয়ে পড়েছে ব্লাস্ট রোগ। তবে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে হাইল হাওরে। সেখানকার কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা জনিয়েছেন, ক্ষেতের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত ব্লাস্ট রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে প্রথমে ধানগাছের শীষ ভেঙে যায়, ধান শুকিয়ে চিটা হয়ে যায়। ধানের এ বিপর্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় ১১ হাজার ৪৫১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। এরমধ্যে ব্রি-২৮ জাতের ধান আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৬৫১ হেক্টর জমিতে। হাওরাঞ্চলের শ্রীমঙ্গল, কালাপুর, মির্জাপুর ও ভুনবীর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের ক্ষেতে ব্লাস্ট রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, হাইল হাওরে মাঠের পর মাঠ পাকা ধানের শীষ বাতাসে দোল খাচ্ছে। এসব ধান কাটার কোনো আগ্রহ নেই কৃষকের। কারণ সব ধানই ব্লাস্টের আক্রমণে চিটা হয়ে গেছে। কেউ কেউ গবাদিপশুর খাবারের জন্য কিছু ধান কাটছেন আবার কেউ জমি খালি করার জন্য ধান কেটে ছড়া-খাল-বিলে ভাসিয়ে দিচ্ছেন।
উপজেলার উত্তর লামুয়া গ্রামের কৃষক ওমর ফারুক জানান, তিনি এ বছর ১২০ বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ ধানের চাষ করেছিলেন। যখন ধানের শীষ দেখা যায় তখন তার মনটা ভরে উঠেছিল। কিন্তু কয়েক দিন পূর্বে আকস্মিক ব্লাস্ট রোগ ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায় স্বপ্ন। পুরো জমির ধান এখন চিটা। কিছু ধান তিনি কেটে এনেছেন গরুর খাদ্যের জন্য। বাকিটা জমিতেই রয়েছে।
তবে উপজেলা কৃষি বিভাগের দাবি, ব্রি-২৮ জাতের ধান আবাদ না করতে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু কিছু কিছু কৃষক দোকান থেকে বীজ কিনে এ ধান রোপণ করেন।
কৃষকরা বলছেন, ধানের বীজ কিনতে বাজারে গেলে ব্যবসায়ীরা ব্রি-২৮ ধান উচ্চ ফলনশীল বলায় অধিক লাভের আশায় কিনেছেন।
রাজাপুর গ্রামের কাওসার মিয়া নামে এক কৃষক বলেন, ‘প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ ধান লাগাইছিলাম। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু যখন ধান আসার কথা তখনই ব্লাস্ট ছড়িয়ে পড়ে। ধানের গাছ ভালা আছে, পাতা ভালা আছে কিন্তু ধান জ্বলে একবারেই শেষ। চিটা হয়ে গেছে। গত বছরও একই অবস্থা হয়েছিল।’ কৃষি বিভাগের কোনো লোক এসে খোঁজখবর নেয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
নোয়াগাঁও গ্রামের এরশাদ মিয়া বলেন, ‘সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ২০ বিঘা জমিনে ব্রি-২৮ জাতের ধান লাগিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ধান বিক্রি করে সমিতির টাকা পরিষোধ করব। কিন্তু কপাল খারাপ, সব ধান চিটা হইয়া গেছে। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
একই ধরনের দুশ্চিন্তার কথা জানালেন তাহির মিয়া, সুন্দর মিয়া, অঞ্জু কর, জোবায়ের মিয়াসহ কয়েকজন কৃষক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। এখন তাদের পথে বসার উপক্রম।
এদিকে গত ৮ এপ্রিল বিকালে শ্রীমঙ্গলে সংবাদ সম্মেলন করেন হাইল হাওরাঞ্চলের সাধারণ কৃষকরা। তারা বলেন, ‘হাইল হাওর এলাকায় বোরো ফসলই অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। কেউ কেউ আউশ ও আমন ধান চাষ করলেও পরিমাণে তা খুবই কম। ব্লাস্ট রোগে হাওরাঞ্চলের প্রায় সব ধানই চিটা হয়ে গেছে। সরকার সহায়তা না করলে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের আর্থিক সহায়তা না করলে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকবে।’
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উজ্জ্বল সূত্রধর বলেন, ‘যেভাবে কৃষকরা দাবি করছেন তা সঠিক নয়। মাঠ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী কিছু জমিতে ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করেছে। এক মাস আগেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব যখন দেখা দিয়েছিল তখন কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সঠিকভাবে তা পালন করেননি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘ব্রি-২৮ পুরাতন জাতের ধান। এ ধান রোপণে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। এটির পরিবর্তে ব্রি-৮৮ বা ব্রি-৮৯ চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কৃষকরা ২ হাজার ৬৫১ হেক্টর জমিতে ব্রি-২৮ জাতের ধান রোপন করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জেলার হাইল হাওর, হাকালুকি হাওর ও কাউয়াদিঘি হাওরে ব্লাস্ট রোগে কিছু ধানের জমি নষ্ট হয়েছে। কৃষি বিভাগ কৃষকদের পাশে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা শুরু হয়েছে। সরকারের কোনো বরাদ্দ বা প্রণোদনা এলে তাদের সহায়তা করা হবে।’