আসিফ শওকত কল্লোল
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৩৭ এএম
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৩ ১২:০৪ পিএম
ফাইল ফটো
পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে প্রথমবারের মতো চারটি মাদার ভেসেল কিনবে সরকার। এর মধ্যে প্রতিটি ১ লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণ ক্ষমতার দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার এবং প্রতিটি ৮০ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার। ঈদের পরেই এই চার মাদার ভেসেল কেনার বিষয়ে চীনের সঙ্গে চুক্তি করবে সরকার।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত মাদার ভেসেল কেনার প্রকল্পটির জন্য খরচ ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭১৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের মধ্যে এসব জাহাজ কেনা হবে। এর মধ্যে চীন সরকারের ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ সহায়তায় এবং ২২৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এ প্রকল্পে জোগান দেওয়া হবে।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘জাহাজ চারটি কেনা হলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দুটি জাহাজ পালাক্রমে ক্রুড অয়েল আনা-নেওয়ার পাশাপাশি অবসর থাকলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনার হিসেবে ভাড়ায় নিযুক্ত করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
বিএসসি জানিয়েছে, জি টু জি ভিত্তিতে চীন সরকারের নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান থেকে জাহাজ সংগ্রহের বিষয়টি অর্থনৈতিকবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক সুপারিশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্রয় প্রস্তাবের কমার্শিয়াল কনট্রাক্ট চূড়ান্ত হয়েছে। ডিপিপি অনুমোদিত হলে চূড়ান্ত ঋণচুক্তি ও এর ধারাবাহিকতায় কমার্শিয়াল কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষরিত হবে।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রে এ জাহাজগুলো পরিচালনার জন্য জাহাজপ্রতি কমপক্ষে ৩৫ জন হিসেবে চারটি জাহাজে বার্ষিক প্রায় ১৪০ মেরিন অফিসার ও ক্রুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া জাহাজগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রক্রিয়ায় আর্থিকভাবে উপকৃত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মূলত বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় এতদিন মাদার ভেসেল আসার সুযোগ ছিল না। এখন দেশে এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে মাদার ভেসেলে সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর সুফল হিসেবে বাংলাদেশও নিজস্ব মাদার ভেসেল কিনবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০১১-২২ মেয়াদে প্রতিবছর গড়ে ১২-১৪ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিমাসে গড়ে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানির চাহিদা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মাদার ট্যাংকারের যাত্রাকাল এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের (এসপিএম) মাধ্যমে তেল খালাস (৪৮ ঘণ্টা) বিবেচনায় প্রতিমাসে একটি রাউন্ড ট্রিপের মাধ্যমে এক লাখ টন তেল দেশে আনা সম্ভব।
বিএসসি সূত্র বলছে, ১৯৭২ সালের বিএসসি প্রতিষ্ঠালগ্নে এর বহরে কোনো জাহাজ ছিল না। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিএসসি সর্বমোট ৪৪টি জাহাজ অর্জন করতে সক্ষম হয়। আশির দশকে বিএসসির জাহাজবহরে তা কমে ২৬টিতে দাঁড়ায়। তবে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি জাহাজ বিক্রি করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে বিএসসির বহরে ৮টি জাহাজ রয়েছে, যাদের দুটি অতি পুরোনো ক্রুড অয়েল লাইটারেজ ট্যাংকার। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক জারিকৃত বিভিন্ন কঠোর বিধিবিধান প্রতিপালন করে পুরোনো এ দুটি জাহাজসহ মোট ৮টি জাহাজ দিয়ে আন্তর্জাতিক রুটে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) আইন, ২০১৯-এর মাধ্যমে সৃষ্ট সুবিধা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক শিপিং ট্রেডে বিএসসির অস্তিত্ব বজায় রাখতে এর বহরে জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ফ্লিটের আধুনিকায়ন করা জরুরি প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে চারটি নতুন জাহাজের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।

জানা গেছে, প্রকল্পে বায়ারস সুপারভাইজার ফি হিসেবে ৩৫ দশমিক ৬১ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তির পর বায়ারস সুপারভাইজার ফি ৩৫ দশমিক ৬১ কোটি টাকার পরিবর্তে ১৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি বাবদ ৫০ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা এবং প্রাইস কন্টিনজেন্সি বাবদ ৭৭ দশমিক ৬২ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। জিওবি অর্থ সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি বাবদ পাঁচ কোটি টাকা এবং প্রাইস কন্টিনজেন্সি বাবদ ৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মো. জিয়াউল হক বলেন, সরকারের ভিশন ২০৪১-কে সামনে রেখে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য তেল আমদানির পরিমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে আমদানিতব্য ক্রুড অয়েল ও রিফাইন্ড প্রোডাক্ট দেশের সুবিধাজনক সময়সূচি অনুযায়ী কম খরচে ও কম সময়ে খালাসের জন্য এই মাদার ভেসেল কেনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই মাদার ভেসেলগুলো কেনা হলে বঙ্গোপসাগর থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে ট্যাংকার থেকে ক্রুড অয়েল ও রিফাইন্ড প্রোডাক্ট স্থলভাগে অবস্থিত ডিপোতে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। তা ছাড়া ক্রুড অয়েল পরিবহনের জন্য বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার করতে এবং নিজস্ব জাহাজের মাধ্যমে সুবিধাজনক সময়সূচি অনুসরণে ক্রুড অয়েলের সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ দুটি মাদার ট্যাংকার কেনা কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া খাদ্য বিভাগ, টিসিবি ইত্যাদির জন্য আন্তর্জাতিক নিলামে সংগৃহীত গম, চাল, ডাল ইত্যাদি বিভাজ্য পণ্য পরিবহনে বিএসসির নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে প্রস্তাবিত বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ দুটিও অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে তিনি জানান।