জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৩ ১২:৩৫ পিএম
প্রবা ফটো
নদীমাতৃক বাংলাদেশে বেশিরভাগ জেলাতেই মৎস্য চাষ প্রকল্প বা হ্যাচারি রয়েছে। এসব হ্যাচারিতে মৎস্য চাষের সময় মাছকে খাবার দিয়ে থাকে। মাছ খাবার গ্রহণের সময় পুকুর পাড়ের ক্ষতিসাধন করে। ফলে পুকুর, ডোবার পাড় ভেঙে পড়ে। এসব ভেঙে পড়া পাড়ের সংস্কারের জন্য সিনথেটিক ফেল্ট দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সিনথেটিক ফেল্ট উৎপাদনের পর সরবরাহ পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) পরিশোধ করে আসছে। কিন্তু এর প্রধান উপকরণ সিনথেটিক পলিস্টার স্ট্যাপল ফাইবার পণ্যটি দীর্ঘ দিন ধরে আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতির সুবিধা পেয়ে আসছে। তবে আসন্ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে দেশে উৎপাদিত সিনথেটিক ফেল্টের ওপর উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ১৫ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও তা ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, সিনথেটিক পলিস্টার স্ট্যাপল ফাইবার ব্যবহার করে সিনথেটিক ফেল্ট উৎপাদন করা হয়। যার এইচএস কোড ৫৬০২.১০.৯০। সিনথেটিক পলিস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের প্রধান কাঁচামাল প্লাস্টিক বোতলের বর্জ্য। যা রি-সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে প্লাস্টিক দানা বা চিপস উৎপাদন করা হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান শ্রমিক নির্ভর প্রতিষ্ঠান, যার অধিকাংশ শ্রমিক ছিন্নমূল শ্রেণির। এই ছিন্নমূল লোকই পলিস্টার স্ট্যাপল ফাইবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মজুরি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এ ছাড়া জনবহুল বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত বেকার বিভিন্ন ধরনের খামারের সঙ্গে সম্পৃত্ত। এর বড় একটি অংশ মৎস্য চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সিনথেটিক ফেস্ট পণ্যটি যেহেতু পুকুর পাড়ের ভাঙন রোধে ও সংস্কারে ব্যবহার করা হয় এবং ঐ সকল প্রান্তিক খামারিরাই তার ভোক্তা, তাই আলোচ্য পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে মূসক কমিয়ে দিলে মূলত ঐ সকল খামারিরাই উপকৃত হবে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটকালে আলোচ্য পণ্যটি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিনথেটিক ফেল্ট একটি কৃষি উপকরণ। এই পণ্যটি কাঁদা মাটির উপর ব্যবহার করে তার ওপর শুকনো মাটি দিয়ে বর্ষা মৌসুমে গাছের চারা রোপণ করা যায়।
সূত্র জানায়, সরকারের ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালার প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে ইতোমধ্যে সিথেটিক ফেল্ট জায়গা করে নিয়েছে। এমতাবস্থায় মৎস্য চাষ প্রকল্প সম্প্রসারণ, গ্রামীণ ও কৃষি অবকাঠামো উন্নয়ন, বেকার সমস্যা সমাধান ও বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
জানা গেছে, বর্তমান সরকার এ সকল কাজে উৎসাহ যোগানের জন্য তাদেরকে নানাভাবে প্রণোদনা দিয়ে আসছে। এই প্রণোদনার অংশ হিসেবে আলোচ্য পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দিলে বা কমালে খামারিদের ক্ষতিগ্রস্ত হ্যাচারি, পুকুর পাড় সংস্কারের কাজে অধিক পরিমাণে ফেস্ট ব্যবহারে উৎসাহ পাবেন। অন্যদিকে মূসক প্রদান করতে হলে উৎপাদিত ফেল্টের মূল্য বেড়ে গেলে প্রান্তিক খামারিদের ওপর অর্থনৈতিক চাপের সৃষ্টি হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২২’ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাদুপানির মাছ ও চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। চাষের মাছ উৎপাদনে এর আগে বাংলাদেশ ছয় বছর ধরে পঞ্চম অবস্থানে ছিল।
ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের ৫৬ শতাংশ মাছ আসছে পুকুর থেকে। পুকুরে মাছ চাষের কারণে গত তিন দশকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ। মাছ চাষ ও ব্যবসায় যুক্ত প্রায় দুই কোটি মানুষ। ১৯৯০ সালে মানুষ বছরে মাথাপিছু সাড়ে সাত কেজি মাছ খেত। এখন সেটা ৩০ কেজিতে পৌঁছেছে।
আসন্ন বাজেটে এই উদ্যোগ নেওয়া হলে এ খাত আরও এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে এর মাধ্যমে রপ্তানি খাতের নতুন সম্ভাবনা, বেকারত্ব বিমোচন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও দেশে কম মূল্যে আমিষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভোক্তাদেরও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটবে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।