জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৩ ১৬:১১ পিএম
দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নারী কর্মকর্তার সংখ্যা উল্লেখযোগভাবে বাড়লেও বাড়ছে না নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছর সেপ্টেম্বরে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয় কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প ও মাঝারি শিল্পে। তার মধ্যে নারী উদ্যোক্তারা পেয়েছেন মাত্র ১৩ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। মাঝারি শিল্পে মোট ঋণের ৪.৭৭ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। অথচ ২০২৪ সালের মধ্যে এ খাতে ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তার মধ্যে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলছেন, তারা মাঝারি শিল্পকে প্রাধান্য দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও নারীদের একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ঋণ জামানত ছাড়াই বিতরণের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো নারী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ঋণ আবেদন পাচ্ছেন না তারা। দ্বিতীয়ত, কিছু আবেদন পাওয়া গেলেও সেই ব্যবসাগুলোর পেছনে অন্য অভিভাবক থাকছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন ঋণগ্রহীতারা ঋণ পেতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণে লেনদেন, জামিনদার, বাণিজ্যিক জায়গা না থাকা ইত্যাদি কারণে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। ব্যাংকারদের মতে, নিরাপত্তার খাতিরেই নিয়ম অনুযায়ী ঋণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় নারীদেরও। যারা এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারেন না তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পান না। নারীদের ঋণ কম হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার ২৫ বছরের ব্যাংকিং জীবনে মাত্র দুজন করপোরেট বা বৃহৎ নারী গ্রাহক পেয়েছি। করপোরেট পর্যায়ে অথবা বৃহৎ শিল্পে নারীদের উপস্থিতি একেবারেই কম। সিংহভাগ ঋণ পুরুষ উদ্যোক্তারা পেয়ে থাকেন।’
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে কিছু ঋণ দেওয়া হয় নারীদের। তবে তার পরিমাণ খুব কম। অনেক সময় দেখা যায়, নারীদের নামে ঋণ নিলেও প্রতিষ্ঠানগুলো পুরুষরা পরিচালনা করেন। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সক্ষমতা ও সাহসিকতার সঙ্গে নারীদের সামনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংকসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংক খাতের মোট কর্মীদের ছয় ভাগের এক ভাগ এখন নারী। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) লিঙ্গ সমতাকে সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে শুরু করেছে। গত এক বছরে ব্যাংক খাতে নারী কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ৬.৮৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় সাত শতাংশ। লিঙ্গ সমতা নিয়ে তৈরি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট নারী কর্মকর্তা ছিলেন ৩১ হাজার ৫৪৮ জন, যা মোট ব্যাংক খাতে ১৬.২৮ শতাংশ। ২০২১ সালে এ খাতে নারীদের সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৫১৩ জন। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে দুই হাজার ৩৫ জন নারী কর্মকর্তা বেড়েছে ব্যাংকে। দেশে নারী কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ বিদেশি ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকে নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৫.৯৪ শতাংশ। এরপর এগিয়ে আছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এখানে নারীদের অবস্থান ১৯.২১ শতাংশ। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় নারীদের অংশগ্রহণ যথাক্রমে ১৬.৪৮ ও ১৪.২৭ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, টেকসই উন্নয়নে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে লিঙ্গসমতা পঞ্চম। বাংলাদেশ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং সব ক্ষেত্রে নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়নে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের প্রতি সব ধরনের অসমতা ও হিংস্রতা দূর করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজের সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। সেজন্য সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের ভূমিকায় কার্যকর অংশগ্রহণ অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, নারী কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ বাড়লেও উচ্চপর্যায়ে তথা বোর্ডে নারীদের অবস্থান অনেক কম। ২০২২ সালের জানুয়ারি-জুন পর্বে বোর্ড সদস্য হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ১৩.৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহে নারী বোর্ড সদস্যের অংশগ্রহণের হার ১৫.৯১ শতাংশ, যা সবচেয়ে বেশি। অপরদিকে বিশেষায়িত ব্যাংকসমূহের নারী বোর্ড সদস্যের অংশগ্রহণ মাত্র ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট ইউনিটের পরিচালক রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি চাকরির তুলনায় নারীদের ব্যাংক খাতে চাকরির নিরাপত্তা ও সার্বিক নিরাপত্তা বেশি। তাই এ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটি, যাতায়াত সুবিধা ভালো থাকায় নারীরা ব্যাংক খাতের জব বেশি পছন্দ করছে।’
রিপোর্টে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহে নারীদের কর্মসংস্থান বদলের হার রাষ্ট্রমালিকানাধীন, বিদেশি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশি। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বা সচেতনতা নীতি প্রণয়ন, নারীদের যাতায়াত সুবিধা, লিঙ্গসমতা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীদের ব্যাংক খাতে অংশগ্রহণ বেড়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আরএফ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ব্যাংকের কাজ কিছুটা কঠিন হলেও ধীরে ধীরে নারীরা এই খাতে চাকরির দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। এই অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো উচিত। এই মুহূর্তে ব্র্যাক ব্যাংকের নারী কর্মীর সংখ্যা ১৪ শতাংশের ওপরে।
ব্যাংকের নারী গ্রাহক সম্পর্কে তিনি বলেন, “নারী গ্রাহক দ্রুত ঋণ পরিশোধ করেন। এসব ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই কম। আমার মতে নারীরা ব্যাংকের সবচেয়ে ভালো গ্রাহক। ব্র্যাক ব্যাংকের যাত্রালগ্ন থেকে নারী গ্রাহকদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে। ২০১৭ সালে শুধু নারী গ্রাহকদের জন্য ‘তারা’ নামের একটি প্রডাক্ট উদ্বোধন করে ব্র্যাক ব্যাংক। এখানেও প্রচুর সাড়া পাচ্ছি আমরা।’