ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৩ ১৬:০২ পিএম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৩ ১৭:৪৩ পিএম
২৫ ফেব্রুয়ারি, সকাল ৮টা। কুয়াশায় ঘেরা চারদিক। মাথায় এক বোঝা খড় নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছেন কৃষক আব্দুর রশিদ। ময়মনসিংহের ত্রিশালের এই কৃষকের রয়েছে একটি ষাঁড় ও দুটি গাভী। গরুর খাবার নিয়ে তিনি বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার সঙ্গে কথা হলে জানান, গরু লালন-পালন করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ খড়, ঘাস নেই। এক মণ খড় কিনতে হয় ৪০০ টাকায়। কখনও ১০০০ টাকা মণও হয়। বর্তমানে এক কেজি ভুসি কিনতে হয় ৭০ টাকায়। এক কেজি প্রস্তুতকৃত খাবারের দাম ৭০-৮০ টাকা।
নওগাঁ জেলার বদলগাছী থানার মামুনুর রশিদ চঞ্চল জানালেন, তারও ৩টি গরু। কিছু চারণভূমি থাকলেও তাদের দুগ্ধজাত প্রাণীর খাদ্য নিয়ে থাকতে হয় দুশ্চিন্তায়। অনেক খামারি দাম বেশি হওয়ায় খাদ্য এখন কম দিচ্ছেন। তাতে গাভী থেকে দুধও মিলছে কম। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বছরে ১৫২ লাখ টন দুধের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদিত হচ্ছে ১০৬ দশমিক ৮ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৫২ দশমিক শূন্য ২ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে দুধ উৎপাদিত হয় ১০৬ দশমিক ৮০ লাখ টন। অর্থাৎ পশুখাদ্যের দামের ধাক্কা এসে লেগেছে দুধ উৎপাদনে।
দেশের সবচেয়ে বেশি গমের চাষ হয় রংপুর বিভাগে। সেখানকার ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গার কৃষকরা কচি গমগাছ কেটে আঁটি বেঁধে বিক্রি করেন। চারণভূমির অভাবে কচি গমগাছকেই পশুখাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন খামারিরা। স্থানীয় খামারি ও বিক্রেতারা বলেছেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে খৈল বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৪৯ টাকা, ভুসি ৪০ টাকা, কুঁড়া ১৫ টাকা, খড় প্রতি আঁটি ৪ টাকা ও ঘাস প্রতি আঁটি ৩ টাকায়। এবার বছরের শুরুতেই দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসেই দাম বেড়ে খৈল ৫০ টাকা, ভুসি ৭০ টাকা, কুঁড়া ১৭ টাকা, ঘাস ৩০ টাকা ও খড় ৬ টাকা আঁটি কিনেছেন কৃষক-খামারিরা। বদলগাছীর আ. হান্নান বলেছেন, শুধু খৈল-ভুসির দামই নয়, ৫০ কেজি লবণের দাম ৫০০ থেকে বেড়ে ১০০০ টাকা হয়েছে।
এক যুগ ধরে বিশ্বব্যাপী গোখাদ্য ও দুগ্ধ উৎপাদন নিয়ে জরিপ চালিয়ে আসছে অলটেক আউটলুক নামে একটি সংস্থা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে, গত এক বছরে এ দেশে দুগ্ধজাত প্রাণীর খাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দুধ উৎপাদনে। দুধের দাম সামান্য বাড়লেও খাদ্যের দাম বেড়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ।
অলটেক আউটলুকে বলা হয়, ইউক্রেনে ফিড উৎপাদন ৩৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের এই যুদ্ধ পৃথিবীর বাকি অংশের ফিড উৎপাদনকেও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে। পশু রোগের কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি দেশে।
অলটেক জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতারা বেশ কয়েকটি পরামর্শও দিয়েছেন। তারা বলছেন, পশুর কল্যাণে খাদ্য উৎপাদন আরও দক্ষতার সঙ্গে বাড়াতে হবে; জলদূষণ কমাতে হবে; একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তি তৈরি করতে হবে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৫০ শতাংশ উত্তরদাতাই বলেছেন, খাদ্য/প্রাণী কৃষি খাতকে প্রভাবিত করতে পরিবেশগত স্থায়িত্ব আরও উন্নত করা প্রয়োজন। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানোর, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের, পুষ্টির মান বাড়ানোর এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও করেছেন তারা। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এসব পরামর্শ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
যা বলছেন উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাদিক অ্যাগ্রোর কর্ণধার মো. ইমরান হোসেন জানান, দুগ্ধ খাতে বিদেশি কোনো বিনিয়োগ নেই। বেসরকারিভাবে ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসছেন, কিন্তু সরকারি কোনো নীতি-সহায়তা নেই। খামারিরা চাইছেন এ দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে
খাপ খায় এমন গাভী। কিন্তু সরকার তার উল্টোপথে হাঁটছে। এখানে হল্যান্ড, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ার জাত (হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান গরু) নিয়ে আসা হচ্ছে। অথচ খামারিরা বলছেন, ব্রাজিলের আবহাওয়ার সঙ্গে আমাদের ভূখণ্ডের মিল বেশি। ‘ব্রাজিলিয়ান পিউর গি’ জাতের গাভী থেকে প্রান্তিক খামারিরাও অনায়াসে ৩০-৩৫ কেজি দুধ পেয়ে থাকেন। এটি বাঁচেও দীর্ঘদিন; রোগবালাইও কম। তাই এখানে এসব গাভী নিয়ে আসা দরকার। তা ছাড়া ৩ লিটার দুধ দেয়, এমন জাতের দেশীয় গাভী যাতে ৬ লিটার দুধ দেয়, সে লক্ষ্যে গবেষণা করা দরকার।
তিনি বলেন, ২০০৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গোখাদ্যের দাম ২ শতাংশ, ৫ বা ৮ শতাংশ করে বেড়েছে। কিন্তু ২০২১ ও ২০২২ সালে দাম বেড়েছে লাফিয়ে। ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন গাভী পালন অনেক ব্যয়বহুল।
মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীপঙ্কর মণ্ডল বলেন, ‘দেশে চারণভূমি কমে যাওয়ায় গাভীগুলো বাড়িতে বা খামারেই পালন করতে হচ্ছে। এতে খাবারও বেশি লাগছে। এদিকে খাদ্যের বড় একটি অংশই আমদানি করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। খাদ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, দুধের দাম সেভাবে বাড়েনি। খামারিরা কোনোমতে টিকে আছেন। মিল্ক ভিটাতেও একই অবস্থা। বিষয়টি আমাদের নিজস্ব উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে। মিল্ক ভিটা অন্য যে খামারিদের থেকে দুধ সংগ্রহ করে, তাদের অবস্থাও একই।
এ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. গোলাম রব্বানী বলেন, দানাদার খাবারের বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়। এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। এ জন্য সরকার খামারি ও ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে। আমাদের দেশে খামারিরা সাধারণত দুধের নিয়মিত বাজার পান না। এই বাজার নিশ্চিত করার কাজ চলছে। সারা দেশে চার শতাধিক দুগ্ধগ্রাম তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে খামারিদের সমন্বিত করে সমিতির মাধ্যমে ক্রেতা-প্রতিনিধিও তৈরি করা হচ্ছে। যাতে তারা সব সময় খামারিদের উৎপাদিত দুধ সংগ্রহ করতে পারেন।