প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২১:৫৪ পিএম
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২২:২১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট দিচ্ছে বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানি গুগল, অ্যামাজন, ফেসবুক, মাইক্রোসফট ও নেটফ্লিক্স। বিজ্ঞাপন বাবদ মোট আয়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে দিচ্ছে তারা। যদিও বাংলাদেশে নিজস্ব অফিস না থাকায় আয়কর দিতে হচ্ছে না এসব প্রতিষ্ঠানকে। তবে এবার বিদেশি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আয়করের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
এখনও ডিজিটাল ইকোনমির আয়ের ওপর কর আরোপের বিধান নেই। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কর আদায় করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিশাল অঙ্কের ব্যবসা করে, তাদের আয়কে কর আরোপের আওতায় আনতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগের বিধান প্রবর্তন করার কথা বলছে দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)। সম্প্রতি প্রাক-বাজেট আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এমন প্রস্তাব দিয়েছে আইসিএমএবি।
আইসিএমএবি প্রেসিডেন্ট মো. আবদুর রহমান খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ’আয়কর আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে স্থায়ী স্থাপনা না থাকলে কোনো কোম্পানিকে কর আরোপের বিধান নেই। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে এখন স্থায়ী অফিস না করেই ব্যবসা পরিচালনা করা যায়।’
তিনি বলেন, ’কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণে ব্যবসা করে যাচ্ছে। তাদের আয়করের আওতায় আনতে, আয়কর আইনের মূলনীতি বজায় রেখে ভ্যাট আইনের মতো স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগের বিধান করা হলে ওই এজেন্টের অফিস বিদেশি কোম্পানির নিজস্ব অফিস হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে তারা তাদের আয়ের ওপর কর দিতে বাধ্য থাকবে।’
আবদুর রহমান খান বলেন, ’এখানে দ্বৈত কর আরোপের চুক্তি সংশোধনের প্রয়োজন হবে না। এর ফলে কর আদায়ের নতুন খাত সৃষ্টি হবে, যা রাজস্ব আদায়ে বড় ভূমিকা রাখবে।’
তবে প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্যাটের আওতায় আনা না গেলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের আয়কর বঞ্চিত হচ্ছে। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ আয়কর পাওয়া গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে। তা ছাড়া এর ফলে দেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বৈষম্য ঘুচবে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার বর্তমানে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির করহার বর্তমানে সাড়ে ২৭ শতাংশ। একক ব্যক্তির কোম্পানির করহার সাড়ে ২২ শতাংশ, ব্যক্তি-সংঘ ও কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা এবং অন্যান্য করযোগ্য সত্তার করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ।
২০২১ সালের ১৩ জুন ফেসবুকের তিনটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন (বিআইএন) নম্বর নেয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসে ফেসবুক ২১৮ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে আর ৩২ কোটি টাকা ভ্যাট দিয়েছে। প্রায় একই সময়ে ভ্যাট নিবন্ধন নেয় গুগল, মাইক্রোসফট ও নেটফ্লিক্স। তারা যথাক্রমে ২২ কোটি, ৪ কোটি ৫৫ লাখ ও ২ কোটি ২৩ লাখ টাকার ভ্যাট দিয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, বিদেশি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানকে আয়করের আওতায় আনার প্রস্তাব ভেবে দেখা হবে। এখন বিদেশে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান কম হলেও ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। ডিজিটাল ইকোনমি থেকে কীভাবে রাজস্ব আদায় করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা করবে এনবিআর।
ভ্যাট ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেটের তথ্যানুযায়ী, দেশে ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের ভ্যাট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে প্রাইসওয়াটার হাউসকুপারস বাংলাদেশ। আর মাইক্রোসফটের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে পোদ্দার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট। তবে আরেক জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব এখনও ভ্যাট নিবন্ধন নেয়নি। ইউটিউবের ভিডিওতে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন দেয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান। অনলাইন ও হুন্ডির মাধ্যমে ইউটিউবে দেওয়া বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ হয়। ভ্যাট নিবন্ধন না নেওয়ায় ইউটিউব থেকে ভ্যাট সংগ্রহ করতে পারছে না রাজস্ব বোর্ড।
এদিকে ফেসবুক, গুগলের বিজ্ঞাপনের অর্থ বিদেশে প্রেরণে কর কর্তনের হার সম্পর্কে রাজস্ব বোর্ডের মতামত চায় অ্যাডভার্টাইসিং এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এএএবি)। সংগঠনটি জানায়, বর্তমানে বিজ্ঞাপন পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন ছাড়াও গুগল ও ফেসবুকে প্রচার করা হয়। যেসব বিজ্ঞাপন দেশীয় মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের অর্থ পরিশোধের সময় আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ৫৩-এর ক ধারা অনুযায়ী ৪ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর কর্তন করে ট্রেজারির মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। তবে ফেসবুক, গুগলের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে করণীয় কী, তা উল্লেখ না থাকায় সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। এ জটিলতা নিরসনে সম্প্রতি এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে এএএবি।
সংগঠনটির সভাপতি ও নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দ মজুমদার চিঠিতে বলেন, ’বিদেশি ওয়েবসাইট, সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের পর অর্থ পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের সময় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপন প্রচারের অর্থ প্রেরণের সময় কর কর্তনের হার সম্পর্কে মতামত জানতে চায় এএএবি।’