চুয়াডাঙ্গা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২১:০৬ পিএম
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২১:২৭ পিএম
ক্ষেতে হারভেস্টার মেশিনে কাটা হচ্ছে আখ। প্রবা ফটো
দেশের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর প্রায় ৯৬ শতাংশ চিনি আমদানি করতে হয়। চাহিদার বাকি ৪ শতাংশ আসে দেশি চিনিকলগুলো থেকে। দেশি চিনিকলগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আখ সংগ্রহে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা সম্ভব হলে চিনি শিল্পের লোকসান কমবে। তাই আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে দেশের চিনি শিল্পের সংকট কাটাতে চায় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন।
দেশের ঐতিহ্যবাহী চিনিকল দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মিল এলাকায় এবার পরীক্ষামূলকভাবে আখ কাটা হয়েছে হারভেস্টার মেশিনে। আগামী মৌসুমে দেশের প্রতিটি চিনিকল এলাকায় এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে পারলে লোকসান অনেকটাই কমে আসবে বলে জানিয়েছেন চিনি খাত সংশ্লিষ্টরা।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আখ কাটার যন্ত্র দেশে আমদানি করেছে আলীম ইন্ডাস্ট্রিজ। এখন ভারতের চালক ও টেকনিশিয়ানরা যন্ত্রটি চালাচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হবে চিনিকলের শ্রমিকদের।
দেশে এতদিন শুধু ধান, গম কাটার হারভেস্টার ছিল। এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কম খরচে ফসল কেটে ঘরে তুলছেন কৃষকরা। এবার আখ কাটার হারভেস্টার এলো। আখ কাটার আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলো বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন।
প্রতিষ্ঠানের জিএম (কৃষি ও প্রকৌশল) প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান মিল্টন বলেন, ‘আমাদের আখ কাটা এবং লোডিং করাটা সনাতন পদ্ধতিতে করায় সর্বোচ্চ পরিমাণ জমিতে আমরা আখের আবাদ করতে পারছিলাম না। এ কারণে সনাতন পদ্ধতি থেকে ম্যাকানাইজড পদ্ধতিতে হারভেস্টিংয়ে প্রবেশ করতে পেরেছি। এতে আমাদের প্রতি টনে শ্রমিক খরচ ৪০০ টাকার মতো কম হবে।’
আলীম ইন্ডাস্ট্রিজের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ডক্টর হুমায়ুন কবীর জানান, এই মৌসুমে আমরা চিনিকলের অপারেটরদের ট্রেনিং দিচ্ছি। আগামী মৌসুমেও ট্রেনিং দেব। মেশিন ঠিকমতো চালানোর জন্য যা যা করার সবকিছু আমরা করব।’
তিনি আরও জানান, এই মেশিনে প্রতি ঘণ্টায় এক থেকে দেড় একর আখ কাটা যায়। এতে ২০ লিটার তেল খরচ হয় অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার টাকার মতো তেল খরচ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে যদি এক একর জমির আখ লেবার দিয়ে কাটা হয়, তাহলে খরচ হতো ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়া শ্রমিকদের সারা দিন পরিশ্রম করতে হতো। সেটা এক ঘণ্টায় করে দিচ্ছে এই মেশিন।
দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে আখ কাটায় আখের গুণগত মান ভালো হচ্ছে। পরিষ্কার আখ যাচ্ছে চিনিকলে। চিনির রিকোভারিও বাড়ছে। আখের পাতাসহ বর্জ্য যা আছে মাটির সঙ্গে মিশে জমিতে জৈব সার তৈরি করছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আকন্দবাড়িয়া গ্রামের আখচাষি ফাইজার হোসেন, দামুড়হুদা উপজেলার ঈশ্বরচন্দ্রপুর গ্রামের ফিরোজ আলী, জীবননগর উপজেলার শিংনগর গ্রামের আশরাফ আলী বলেন, জীবনে প্রথম আখ কাটার মেশিন দেখলাম। আখ কাটা দেখতে বেশ ভালো লাগল। কত তাড়াতাড়ি আখ কাটছে। আখ কাটতে আমাদের লেবার পেতে সমস্যা হয়। এ রকম মেশিন হলে আর অসুবিধা নেই। আমরা আখ লাগাব।’
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘কেরুর খামারে প্রতিবছর প্রায় দেড় হাজার একর জমিতে আখ চাষ হয়। আধুনিক প্রযুক্তির এই মেশিনে আখ কাটতে পারলে অনেক সাশ্রয় হবে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আখ চাষ কমে যাচ্ছে। নতুন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা আশা করছি ঘুরে দাঁড়াব। আগামী বছর থেকে প্রতিটি খামারে আমরা হারভেস্টারের মাধ্যমে আখ কাটব।’
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান অপু বলেন, ‘আমাদের সুগার মিল করপোরেশন একটা ক্রান্তিলগ্নে আছে। আমরা আখ ও চিনির উৎপাদনে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের আখ চাষ কমে গেছে। তবে আমাদের সচিব মহোদয়ের সহযোগিতায় একটা নতুন যুগে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি। আমরা হারভেস্টার ও কাল্টিভেশন মেশিনে আখ চাষে একটা পরিবর্তন আনব।’