বগুড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল
বগুড়া অফিস
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৭:০০ পিএম
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৮:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় আবারও ঝুলে গেল জমি অধিগ্রহণের কাজ। এবার বাধা হয়ে দাঁড়াল প্রস্তাবিত এলাকায় হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইন। যে কারণে প্রকল্পটির জন্য ভূমির মালিকদের কাছে জমি অধিগ্রহণের নোটিস প্রদানের ছয় বছর পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) পক্ষ থেকে আবার নতুন এলাকায় জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ওই প্রস্তাবের আলোকে স্থানীয় জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণের জন্য দাগ নম্বরসহ জমির তালিকা দ্রুততার সঙ্গে তৈরি করলেও বেজার পক্ষ থেকে আর কোনো সাড়া মিলছে না।
এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের বাকি ১০ মাস মেয়াদে বড় ধরনের ওই প্রকল্পের বাস্তবায়ন তো দূরের কথা জমি অধিগ্রহণের মতো প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন। প্রশাসন এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ সময় রুটিনওয়ার্ক ছাড়া প্রশাসনের পক্ষে নতুন করে কোনো কাজে হাত দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজটি যে বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে হচ্ছে না, সেটি একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়।
এর আগে অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ দেড়গুণ নাকি তিনগুণ দেওয়া হবে, তা নিয়ে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম জটিলতা দেখা দেয়। এ নিয়ে প্রায় ৩ বছর কেটে যাওয়ার পর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বেজার পক্ষ থেকে প্রকল্পটি লাভজনক হবে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবারও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলা হয়। তার কয়েক মাস পর বেজার ওয়েবসাইটে ২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করার কথা জানিয়ে তা ৩ বছরের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছিল। তবে ঘোষিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করার আগেই বেজা কর্তৃপক্ষ প্রকল্প এলাকায় হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইন নতুন প্রতিবন্ধক হিসেবে তুলে ধরল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় দলীয় এক জনসভায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বড় ধরনের ৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বেজা এবং বগুড়া জেলা প্রশাসন যৌথভাবে কাজ শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় জেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে বগুড়া-নাটোর মহাসড়কসংলগ্ন শাজাহানপুর উপজেলার আশেকপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার ২৫১ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তীকালে জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে ভূমি মালিকদের নামে ২০১৭ সালের ১২ জুলাই ৩ ধারা নোটিস ইস্যু করা হয়। এরপর ভূমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে পরের বছরের ২৯ মার্চ ভূমি মালিকদের ৬ ধারার নোটিস ইস্যু করা হয়। এরপর যখন প্রস্তাবিত জমির মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন ভূমি মালিকদের পক্ষ থেকে জমির মূল্য দেড়গুণের পরিবর্তে ২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী তিনগুণ চেয়ে উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। তখন স্থানীয় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মামলার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।
এ নিয়ে প্রায় ৩ বছর কেটে যাওয়ার পর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক জানিয়েছিলেন, তিনগুণ ক্ষতিপূরণ চেয়ে জমি মালিকদের করা মামলা কোনো ফ্যাক্টর নয়। বরং বগুড়ায় ওই প্রকল্পটি লাভজনক হবে কি না, সে ব্যাপারে বেজা কর্তৃপক্ষ নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করতে চায়। আর প্রকল্প এলাকা একাধিকবার পরিদর্শন শেষে নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কারণ জানতে চাইলে বেজার তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার (ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) সরকারের যুগ্ম সচিব মো. মনিরুজ্জামান বলেছিলেন, মূলত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যই আবারও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারিজ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বামমা) বগুড়া জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি সরকার বাদল প্রকল্পটি সম্পর্কে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘যখন প্রকল্পের জন্য জায়গা দেখা হয়, তখন আমি শাজাহানপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানেরও দায়িত্বে ছিলাম। বর্তমানে যে জায়গাটি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি দেখে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী তখন আমাকে বলেছিলেন, চেয়ারম্যান সাহেব ওকে। তার সম্মতির পরই তো জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাহলে এখন আবার নতুন করে জায়গা দেখার কী আছে?’
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাছুদার রহমান মিলন জানান, বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলে অন্তত এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি বগুড়া সদরের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান রিপু এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। তবে এ-ও বলেন, সরকারের অনুমতি পেলে প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমেও বাস্তবায়ন সম্ভব।
সরকারের মাত্র ১০ মাস মেয়াদ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব কি না জানতে চাইলে বগুড়া-৬ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান রিপু বলেন, ‘আমি বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করব। আশা করি এর মাধ্যমে এই প্রকল্পসহ বগুড়ার অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প পাব।’