সোহেল চৌধুরী
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৯:৪০ এএম
আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১১:৩৩ এএম
যশোরের গদখালীতে ফুল বিকিকিনিতে ব্যস্ত বিক্রেতা-ক্রেতারা। প্রবা ফটো
ফুল ফুটক বা না-ই ফুটুক কাল বসন্ত। বসন্তের আগমনীতে সুবাতাস বইছে ফুলের ব্যবসায়। পয়লা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কেন্দ্র করে ৩০০ কোটি টাকা ফুল বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন। চাষি থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন এই তিন দিবসে সর্বোচ্চ বিক্রির আশায়।
উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ১৪ ফেব্রুয়ারি বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস। তারপর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দুই দিবসে বাজারে ফুলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রাখতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন তারা। বরাবরের মতো এ বছরেও ফুলের উৎপাদন ভালো হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ফুল সরবরাহ করা যাবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ফুলের দাম এবং বিক্রির পরিমাণের বিষয়ে শাহবাগের পাইকারি বিক্রেতা ফ্লাওয়ার গার্ডেনের মো. জেনারুল শেখ বলেন, ‘এ বছর ফুলের দামটা একটু বেশি। প্রতি পিস আগের চেয়ে ৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আছে। তবে এ বছর বোঝা যাচ্ছে বাজারটা ভালো যাবে। খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতারা ইতোমধ্যে ফুল অর্ডার আগেভাগেই দিয়ে রাখছে।’
আর ওয়াহিদা পুষ্পালয়ের স্বত্বাধিকারী শেখ কাউসার বলেন, ‘এবার আমরা অনেক আশাবাদী। গত বছর দোকানে এই সময়টাতে দিনে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা বিক্রি করছি। তবে এবার বিক্রির পরিমাণ দৈনিক ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা যাবে। বাজার বেশ ভালো যাচ্ছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির (বিএফএস) সভাপতি বাবুল প্রসাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসের এই এই দুটি দিবসে চাষি থেকে ব্যবসায়ীরা সবাই প্রত্যাশায় থাকি ভালো একটা বিকিকিনির। এই মাসকে ঘিরে সবাই আগেভাগেই প্রস্তুত থাকে। বাজারে ফুলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। আমাদের আশা এই এই দুই দিনে ফুল বিক্রির পরিমাণ উঠবে ৩০০ কোটি টাকায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর এই তিনটি দিনকে কেন্দ্র করে দৈনিক ফুল বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা। তবে এ বছর সবকিছু ঠিক থাকলে এই বিক্রির পরিমাণ দিনে হবে ৯০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। ফুলের ব্যবসা কিছুটা মন্দা হয়ে যায় কৃত্রিম ফুল আমদানিতে। কৃত্রিম ফুলের কারণে সতেজ ফুলের বাজার নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৩০ শতাংশ।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৯৩০ একর জমিতে ৩২ হাজার ১২০ টন ফুল উৎপাদিত হয়।
সংস্থাটির কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষ গ্রন্থের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে গাঁদা ফুলের উৎপাদন ১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন, গোলাপ ২১ হাজার ৯৮১ মেট্রিক টন, টিউব গোলাপ ৪ হাজার ১২৯ মেট্রিক টন, বেলি ৭ মেট্রিক টন, গ্লাডিওলাস ৪ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন, কসমস ৭ মেট্রিক টন, চন্দ্রমল্লিকা ১১ মেট্রিক টন, ডালিয়া সাড়ে ১২ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এসব ফুলের বড় অংশ বিক্রি হয় রাজধানীর শাহবাগ এবং আগারগাঁও এলাকায়। আর প্রধান এই দুই বাজারে ফুলের জোগান আসে যশোর, নারায়ণগঞ্জ এবং সাভার এলাকা থেকে। এখান থেকেই সারা দেশের খুচরা বিক্রেতারা ফুল সংগ্রহ করে থাকেন। পাইকারি বাজারে গত বছরের তুলনায় প্রতিটি ফুলের দাম মানভেদে বেড়েছে ৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে মানভেদে একটি গোলাপ ৫ থেকে ৬০ টাকায়। জারবেরা, গ্লাডিওলাস ২০ থেকে ৪০ টাকা, রজনীগন্ধা ৫ থেকে ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি হাজার গাঁদা ফুল বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে।
দেশের বাজারে বাহারি রকমের সতেজ ফুল দাপট দেখালেও রপ্তানি কার্যক্রমে রয়েছে বেশ মন্থর গতি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবির) গত ৭ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফুল থেকে রপ্তানি আয় উঠানামা করেছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার ডলারের মধ্যেই। ইপিবির তথ্য বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফুল রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮০ হাজার ডলার। এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০ হাজার ডলার বেড়ে আয় হয়েছে ৯০ হাজার ডলার।
তবে চমক ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ডলারের ফুল রপ্তানি করে। এরপরের অর্থবছরেই রপ্তানি আয় গিয়ে নামে ৩০ হাজার ডলারে। তারপর ২০২০-২১ অর্থবছরে ফুল থেকে রপ্তানি আয় আবার ওঠে ৯০ হাজার ডলারে। একইভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে ফুল রপ্তানি হয় ৮০ হাজার ডলার। আর চলতি ২০২২-২৩ (জুলাই-জানুয়ারি) অর্থবছরের রপ্তানি হয়েছে ৪০ হাজার ডলার। যা তার আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি।
ফুল রপ্তানি কার্যক্রমের বিষয়ে বাংলাদেশ ফুল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি এম আহসান উল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘করোনার পর থেকে ফুল রপ্তানি কিছুটা ধীর গতিতে এগোচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের ফুল রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে। আগে দেশে টিউলিপ উৎপাদন হতো না, এখন টিউলিপও উৎপাদন হচ্ছে। আর এই টিউলিপ রপ্তানির চিন্তা আমাদের রয়েছে। একই সঙ্গে লিলিয়াম ও অর্কিডের উৎপাদন বাড়ছে। সব মিলিয়ে ক্রেতাদের চাহিদামতো ফুল সরবরাহের সুযোগ বৃদ্ধি করা গেলে এই খাত থেকে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।