যশোর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:১৪ পিএম
প্রবা ফটো
লাল, হলুদ, হালকা বেগুনিসহ সাত রঙের বাহারি টিউলিপ ফুটছে যশোরের গদখালীতে। শীতপ্রধান অঞ্চলের এই ফুল ফোটাতে যশোরের কৃষকদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ চেষ্টায় তারা সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ঝিকরগাছার গদখালীর বেশ কয়েকটি বাগানে এবার ফুটেছে নানা রঙের টিউলিপ। ভালো দাম পাওয়ায় টিউলিপ চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুলের দুনিয়ায় এ এক ভিন্ন স্বাদ। অন্যরকম অনুভূতি। তাই তো পহেলা ফাল্গুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস সামনে রেখেই চাষ করা হয়েছিল এই ফুল। ফলে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছেন চাষিরা।
গত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবারও টিউলিপ চাষ করেছিলেন গদখালীর পানিসারা এলাকার ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বসন্ত উৎসব ও ভালোবাসা দিবস সামনে রেখে এবারও জানুয়ারিতে ৫ শতক জমিতে টিউলিপের কাণ্ড লাগিয়েছিলাম। সরকারি সহযোগিতায় নেদারল্যান্ডস থেকে এই ফুলবীজ এনে জমিতে লাগানো হয়েছিল। সেই গাছগুলোতে ইতোমধ্যে ফুল এসেছে। তবে এ বছর খুব দ্রুত গরম পড়ে যাওয়ার কারণে ফুল বেশিদিন গাছে থাকবে না।’
তিনি বলেন, এবার ক্ষেতে সাত রঙের টিউলিপ ফুটেছে। এর মধ্যে পারপেল প্রাইড (বেগুনি) নতুন জাত। বাকি জাতগুলো গত বছরের পুরোনো, যার মধ্যে এন্টার্কটিকা (সাদা), লালিবেলা (লাল), স্ট্রং গোল্ড (হলুদ), জান্টুপিঙ্ক (গোলাপি), ডেনমার্ক (কমলা ছায়া), মিস্টিক ভ্যান ইজক (গোলাপি) রয়েছে।
যশোর সদর উপজেলার গোপালপুর গ্রাম থেকে ফুলের রাজ্য গদখালীতে এসেছেন জেরিন রহমান। বাড়ির কাছে ফুলের রাজ্য হলেও নানা কারণে এতদিন আশা হয়নি। অবশেষে গদখালীতে আসার অনেক দিনের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে তার।
গদখালীতে টিউলিপ ফুল দেখতে আসা রামিম হাসান বলেন, ‘টিউলিপ ফুলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি। এলাকার অন্যান্য ফুলও ভালো। পরিবেশটাও চমৎকার। সবকিছু মিলে এ যেন দেশের বুকে একটুকরা নেদারল্যান্ডস।’
গদখালীতে টিউলিপ শুধু সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে না। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করছে চাষিদের। ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘৫ হাজার কাণ্ড নেদারল্যান্ডস থেকে আনা হয়েছে। বীজ বপন, জমি তৈরিসহ অন্যান্য খরচ হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। বর্তমানে এক একটি টিউলিপ বিক্রি করছি ১২০ থেকে ১৬০ টাকা। গড়ে যদি ১৩০ টাকাও বিক্রি হয় সে ক্ষেত্রে ৫ শতক জমিতে দেড় লাখ টাকা লাভ হবে ২ মাসে।’
টিউলিপের নতুন চাষি মঞ্জুরুল করিম বলেন, ‘আমি ১০০ কাণ্ড লাগিয়েছিলাম। তাতে ফুল এসেছে। নেদারল্যান্ডসের এই ফুলবীজের প্রতিটির দাম পড়েছিল ৭০ টাকা। আর এক পিস টিউলিপ বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। সন্ধ্যা হলে বন্ধ আর সকাল হলেই পাপড়ি মেলে এই ফুল।’
এ বছর নতুন টিউলিপ চাষ করেছেন শাহাজান হোসেনও। তিনি বলেন, টিউলিপ ফুল দেখতে এ অঞ্চলে প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটছে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার। টিউলিপের দৃষ্টি নন্দন সৌন্দর্য ও হাসিতে মুগ্ধ করছে ফুলপ্রেমীদের।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, বসন্তের আগমনে প্রকৃতি খুলে দিয়েছে দক্ষিণা দুয়ার। বইছে ফাগুনের হাওয়া। শীতের রূক্ষতা কাটিয়ে ফুলে ফুলে রঙিন হচ্ছে চারদিক। আর এই সময়ে ষড়ঋতুর বাংলাদেশে টিউলিপের আগমন শুধু বিশ্বই নয়; বরং নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে দেশের ফুলচাষিদের।
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, রাজসিক সৌন্দর্যের টিউলিপ ফুলের কথা উঠলে প্রথমেই আসে নেদারল্যান্ডসের নাম। কারণ, দেশটি পৃথিবীর প্রধান টিউলিপ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। মূলত শীতপ্রধান দেশের ফুল এটি। আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশে টিউলিপ ফুলের চাষ এতদিন অসম্ভবই মনে করা হতো। আর এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের ঝিকরগাছার গদখালীর ফুলচাষি ইসমাইল হোসেন। তার বাগানজুড়ে ফুটেছে নানা রঙের বাহারি টিউলিপ। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় টিউলিপ ফুলের বাল্ব বা কন্দ এনে রোপণ করেছিলেন তিনি। তার সেই বাগানটিই এখন হয়ে উঠেছে এক টুকরো নেদারল্যান্ডস।
মাসুদ হোসেন পলাশ আরও বলেন, ‘এ বছর আগেভাগেই গরম পড়ে যাওয়ার কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। হয়তো ফুল বেশিদিন গাছে ফুটে থাকবে না। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। নতুন ফুলের জাত হওয়ায় আমাদের পক্ষ থেকে কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘আসলে মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। দামি ফুলের ব্যবহার বেড়েছে। সর্বোচ্চ মূল্যমানের এই ফুলে লাভও বেশি। সামনে বসন্ত উৎসব ও ভালোবাসা দিবস, আশা করা যায় এই ফুলটি ভালো দামেই বিক্রি হবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।’