প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:২৯ পিএম
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। ফাইল ফটো
এমবি নিট ফ্যাশনস লিমিটেড নামে নারায়নগঞ্জের একটি কোম্পানি ২০১৫ সালে রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করে। কিন্তু তা আসলেই রাসায়নিক কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ করে চট্টগ্রাম কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তারা। তাই পরীক্ষার জন্য তা ঢাকার বাংলাদেশ কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে (বিসিএসআইআর) পাঠানো হয়। ফল পেতে সময় লাগে ২০ দিন। এতে প্রতিষ্ঠানটির বাড়তি সময় ও অর্থ অপচয় হয়। অথচ আমদানিকারকের মতে, এই কাজের জন্য দুই দিনই যথেষ্ঠ ছিল।
শুধু এমবি নিট ফ্যাশনস লিমিটেডই নয়, এই প্রতিষ্ঠানটির মতো এমন শত শত আমদানি কিংবা রপ্তানি চালান পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিসিএসআইআর, ওষুধ প্রশাসনের অধীনে উদ্ভিদ সংগনিরোধ শাখাসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে হয়। ফলাফল পেতে অনেক ক্ষেত্রেই দুই মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এতে বাড়তি সময় ও খরচের পাশাপাশি হয়রানির শিকার হতে হয় ব্যবসায়ীদের।
আমদানি-রপ্তানিকারকদের ব্যবসা সহজ করা, বিশেষত আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বেস্ট প্রাকটিসকে অনুসরণের অংশ হিসেবে কাস্টমস সংক্রান্ত কার্যক্রমের অটোমেশন ও আধুনিকায়নে গত এক দশক ধরে বিস্তর আলোচনা হলেও বাস্তবে অগ্রগতি খুবই সামান্য। ফলে ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে কার্যক্রমে অগ্রগতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, কাস্টমসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৯টি এজেন্সির কার্যক্রমকে একীভূত করতে ২০১৭ সালে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিও) নামে একটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল এনবিআর। এর উদ্দেশ্য ছিল, ব্যবসা সংক্রান্ত যে কোন কাজের জন্য একজন উদ্যোক্তা দ্বারস্থ হবেন কেবল এনএসডব্লিওর। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ফিডব্যাক অটো কালেক্ট করবে এনএসডব্লিও। এর মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি ও কাস্টমস সংক্রান্ত কাজের জন্য একজন ব্যবসায়ীকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। এতে সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে।
প্রাথমিকভাবে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য ঠিক করা হলেও পেরিয়ে গেছে প্রায় ৩ বছর। এখনো এর কাজ শেষ হয়নি। নতুন করে ২০২৩ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হলেও, এই সময়ের মধ্যেও বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে এনবিআরের কর্মকর্তারাই সংশয় প্রকাশ করেছেন।
এনএসডব্লিওর মতো কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থার অটোমেশন নিয়ে বহু আলোচনা হলেও তার সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে। গত বছরের আগস্টে কয়েকটি কার্যক্রম অটোমেটেড করার ট্রায়াল রান উদ্বোধন করা হয়েছে। যা চলতি বছরের জুলাই থেকে পুরোদমে শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে।
এছাড়া ২০১৯ সালে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সিস্টেমের কাজও আর আগোয়নি। বরং কাস্টমস বিভাগের সক্ষমতার ঘাটতি ও আমদানিকারকদের অনাগ্রহে ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানও তা ঠিকমতো ব্যবহার করছে না। এইও’র অধীনে ট্রাস্টেড ট্রেডারদের পণ্য বা কাঁচামাল কাস্টমস সংক্রান্ত কার্যক্রম ছাড়াই বন্দর থেকে সরাসরি আমদানিকারকের ওয়্যারহাউজে আনা যাবে। সম্প্রতি নতুন করে আরো কিছু প্রতিষ্ঠানকে এ সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একইভাবে প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং অফ কার্গো, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিটের (পিসিএ) মত কার্যক্রম ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। অটোমেশনের জন্য সহায়ক নতুন কাস্টমস আইনও ঝুলে আছে অনেকদিন ধরে।
কেবল কাস্টমস অটোমেশন নয়, ভ্যাট সংক্রান্ত কাজ পুরোদমে অনলাইন করতে নেওয়া ভ্যাট অনলাইন প্রজেক্ট এখনো বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়নি। আয়করের অগ্রগতিও সামান্য। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, অটোমেশন নিয়ে গত আট নয় বছর ধরে অনেক কথা বলা হলেও বাস্তবে কাজটি ব্যাপকভাবে ঝিমিয়ে পড়েছে। টাকা খরচ হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে তাদের।
তবে এনবিআরের কাস্টমস বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, অটোমেশন কার্যক্রমের কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে মূল কারণ কোভিডের অভিঘাত। এছাড়া এনএসডব্লিও’র কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর মাঝপথে সিদ্ধান্তহীনতা এই কার্যক্রমকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। তবে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারের মাধ্যমে আমদানির ক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি এবং পেমেন্ট অনলাইনে হচ্ছে। এছাড়া কিছু কাস্টমস হাউজে ই-অকশন, ই-টেন্ডার চালু রয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অটোমেশন কার্যক্রম সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন না হওয়ার অন্যতম কারণ ধারাবাহিকতার অভাব।’ তিনি বলেন, দেখা গেল, প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই কেউ কেউ হয়তো চায় না। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য এজেন্সির সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এজন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয় বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত করা ইজ অব ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। এই পিছিয়ে থাকার জন্য কাস্টমস ও বন্দর সংক্রান্ত দক্ষতার অভাব অন্যতম কারণ।
এছাড়া বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্স (এলপিআই) ২০১৮ অনুসারে, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্ডিয়া, কম্বোডিয়াসহ প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ। এর পেছেনে রয়েছে কেবল পাকিস্তান ও নেপাল। আবার এলপিআইয়ের ৬টি ইন্ডিকেটরের মধ্যে সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স কাস্টমসের ক্লিয়ারেন্সে।
বন্দরে কাস্টমসের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে সর্বশেষ ২০১৫ সালে করা টাইম রিলিজ স্টাডির (টিআরএস) রিপোর্ট অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি পণ্য খালাসে গড়ে সময় লাগে ১১ দিনের বেশি। আর রপ্তানি পণ্যে ৫ দিনের বেশি, যা এশিয়ার প্রতিযোগী অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কাস্টমসের অটোমেশনের কাজটি সময়মত শেষ হলে ব্যবসায়ীদের সময়, ব্যয় ও হয়রানি কমতো। কিন্তু যাদের এটি করার দায়িত্ব, তাদের মধ্যে কারোর হয়ত ইনকাম কমে যাবে বলে করতে চাচ্ছেন না।’
তিনি এনএসডব্লিওর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘এখানে যে ৩৮টি এজেন্সি নির্ধারণ করা হয়েছে, তার একটি অংশ বিকেএমইএ। আমাদের কাছে যখন যা ইনপুট চাওয়া হয়েছে, দিয়েছি। কিন্তু অনেকদিন ধরেই তারা (এনবিআর) আমাদের এ বিষয়ে আর ডাকছে না।’