প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২২:২০ পিএম
প্রবা ফটো
বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ হয়েছে রাষ্ট্রকে দহন, শোষণ ও অবলোপনের মাধ্যমে। নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামীতেও এর বাইরে কেউ এগোতে পারবে বলে মনে হয় না। ষষ্ঠ সানেম অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে ‘রাষ্ট্র এবং ব্যবসার মধ্যে শক্তির গতিশীলতা : বাংলাদেশে পুঁজিবাদ কীভাবে বিকশিত হচ্ছে?’ শীর্ষক আলোচনায় এসব বলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশে পুঁজি আহরিত হয়েছে তিনটি উপায়ে। প্রথমত, স্বাধীনতার পর যেসব পরিত্যক্ত সম্পদ ছিল, সেগুলো গ্রহণ ও বণ্টন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি সহায়তায় অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নিয়ে সেখান থেকে পুঁজি সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। তৃতীয়ত, উন্নয়ন অর্থায়নের প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে সেগুলো আত্মসাৎ করা হয়েছে, যেখান থেকেই অনাদায়ী ঋণের সূত্রপাত। এক্ষেত্রে নব্বই দশকের পর স্টক মার্কেটে ম্যানুপুলেশন করে অনন্ত তিনবার অর্থ লুণ্ঠন করা হয়েছে। আর বর্তমানে অতিমূল্যায়িত বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশে পুঁজিবাদ সঠিক পথে এগোতে পারেনি।
মেগা প্রকল্পের চেয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে কম গুরুত্ব দেওয়ার সমালোচনা করে দেবপ্রিয় বলেন, ২০টি মেগা প্রকল্পের অর্ধেক বাজেট স্বাস্থ্য খাতে, সমপরিমাণ বাজেট শিক্ষা খাতে, যা খুবই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পিছিয়ে পড়া মানুষদের ওপর।
এখানে ট্রেড বডিতে নির্বাচন হয় না, নমিনেশন বা চুক্তির মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। যার ফলে যে নির্বাচিত হন, তিনি সংগঠনের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন না। তাতে যে নির্বাচিত করেছেন তার হয়ে কাজ করার চেষ্টা করেন সব সময়।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ এখন ক্রান্তিকাল পার করছে। যেসব বিষয় নিয়ে কয়েক বছর আগে থেকেই বলা হচ্ছিল, সেগুলোতে কর্ণপাত করেনি সরকার। এখন আইএমএফের পরামর্শে সেগুলো করা হচ্ছে। বর্তমান অবস্থায় উত্তরণকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প নেই। অন্যথায় ২০৪১ সালে কাঙ্ক্ষিত উন্নত দেশ হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে বর্তমান পরিস্থিতি।
আরেক বক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান এম এম আকাশ বলেন, রাজনীতি থেকে যদি মানি পাওয়ার, মাসল পাওয়ার এবং ম্যানুপুলেশন দূর করা না গেলে দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। এসব প্রভাবের কারণে বড় বড় ব্যবসায়ীর কাছে নতি স্বীকার করে সরকার। ফলে আইনকানুন ঠিক থাকে না, সুশাসন থাকে না। তখন একই অপরাধে একজন শাস্তি পায়, অন্যজন পায় না।
রাজনীতিকে যদি অর্থশক্তির হাত থেকে মুক্ত করা না যায়, তবে রাজনীতি এমনই হবে। অসৎ লোকের কাছে সর্বময় ক্ষমতা চলে যায়, তখন ভোট না করেও ভোট হয়, রাতের বেলা ভোট হয়, এক টাকার কাজ করতে তিন টাকা খরচ হয়। তাই বাংলাদেশ কোনদিকে যাবে, তা এখনই ঠিক করতে হবে।
আলোচনা শেষে সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, আগে রাজনীতি করতেন শিক্ষক, আইনজীবী, অব্যবসায়ী ও অচাকরিজীবীরা। পরে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে প্রবেশ শুরু করেন। এখন রাজনীতিবিদরা ব্যবসায় প্রবেশ করছেন, যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য সুখকর না।
অনুষ্ঠানে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বীশীল দলীয় ব্যবস্থা থেকে কর্তৃত্বশীল দলীয় ব্যবস্থায় গিয়েছে। এটা নীতিনির্ধারণীতে পুঁজিবাদের প্রভাব বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশে রাজনীতি করা খবই ব্যয়বহুল। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য দেশে দেড় কোটি টাকা লাগে। যেখানে যুক্তরাজ্যে সংসদ সদস্য হতে ১ লাখ ডলার ব্যয় করলেই চলে। এ পরিস্থিতি থেকে বের না হলে পুঁজিবাদের কাছে রাজনীতিবিদদের অবস্থা আরও দুর্বল করে তুলবে। যেসব দেশ রাজনীতিক ব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি, সেসব দেশে আদানির মতো ব্যবসায়ী হবে, ট্রাম্পের মতো নেতা হবে।
সানেমের এই আলোচনায় সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন সিপিডি সম্মানীত ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স এবং উন্নয়নের (বিআইজিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মির্জা এম হাসান। এ ছাড়াও প্যানেল বক্তা হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের (বিইএন) প্রতিষ্ঠাতা ড. নুরুল ইসলাম এবং অর্থনীতিবিদ ড. স্বপন আদনান।