আমিনুল ইসলাম মিঠু
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৩ ১০:০৪ এএম
আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:১৯ এএম
ফাইল ফটো
বর্তমানে দেশে একজন মানুষ বছরে ২৭ কেজি মাংস খেয়ে থাকেন বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে
জানিয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। সে হিসাবে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের জন্য বছরে
চাহিদা রয়েছে ৪৪ লাখ ৫৫ হাজার টন পোল্ট্রি (মুরগি) মাংস। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৩৮
লাখ টন, যা মোট চাহিদার ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ চাহিদার ৬ লাখ ৫৫ হাজার টন কম উৎপাদন হচ্ছে।
তবে খামারি পর্যায়ে সক্ষমতা থাকায় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির জন্যও উৎপাদন
বৃদ্ধি করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা। কিন্তু সরকার সেই নীতিমালা
করতে না পারায় দেশের মানুষ কোন মানের মুরগির মাংস খেয়ে থাকেন তা যেমন নির্ণয় হচ্ছে
না, তেমনি বিদেশেও রপ্তানির প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।
বর্তমানে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে মুরগির মাংস রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও
ব্যবসায়ীরা তা কাজে লাগাতে পারছেন না নীতিমালার অভাবে। ২০১৯ সালে বলা হয়েছিল, সব সংকট
কাটিয়ে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্ববাজারে শুরু করা যাবে রপ্তানি। কিন্তু পরিকল্পনা আর সক্ষমতা
বৃদ্ধির চক্করেই পড়ে আছে সব সম্ভাবনা। এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের
দেশগুলোতে পোল্ট্রি মাংস রপ্তানির বড় বাজার রয়েছে। ইউরোপের বাজারে এখন একচেটিয়া ব্যবসা
করছে থাইল্যান্ড ও ব্রাজিল। সেখানে বাংলাদেশের পোল্ট্রি মাংসের দাম কম হওয়ায় রপ্তানিতে
প্রতিযোগিতাও সহজ হবে। কিন্তু সবার আগে দরকার নীতিমালা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জিনাত সুলতানা জানিয়েছেন, দেশে এখন বছরে সাড়ে
৯২ লাখ টনের বেশি মাংস এবং ২ হাজার ৩৩৫ কোটির বেশি ডিম উৎপাদন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪১
শতাংশ মাংস উৎপাদন হয় পোল্ট্রি খাতে। রপ্তানি শুরু হলে মান বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনও
বাড়বে। তবে রপ্তানির জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরাপদ প্রসেসিং জোন। প্রসেসিং জোনের আগে
দরকার নীতিমালা।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মো. মহসীন প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে বলেন, পোল্ট্রি রপ্তানিতে তাদের সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় নীতিমালা করতে
না পারা এবং উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো সমাধানে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ না থাকায় সেটা সম্ভব
হচ্ছে না। ব্যক্তিউদ্যোগে রপ্তানি করতে গেলেও নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। মানসম্মত
উৎপাদন ব্যবস্থাপনাও গড়ে ওঠেনি দেশে। তিনি বলেন, রপ্তানি করতে হলে মান সনদের প্রয়োজন
হয়। সেটা পেতেও বেগ পেতে হচ্ছে। ঢাকায় অধিদপ্তরের একটি ও সাভারে একটি ল্যাবরেটরি রয়েছে। তবে সাভারের
ল্যাবরেটরিতে সাধারণ ক্যালসিয়াম পরীক্ষা করাতে গেলেও ১০ গুণ বেশি টাকা খরচ হয়। এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো গাইডলাইনও তৈরি হয়নি।
যেসব কারণে রপ্তানি করা যাচ্ছে না, মোটামুটি একই কারণে পোল্ট্রি শিল্পের শক্ত
ভিত তৈরি হয়নি। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে দেশে এই শিল্পের যাত্রা শুরুর পর থেকে মাংস
সুলভ হলেও খুব কম খামারি তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছেন। সময়ে অসময়ে বিপুল ক্ষতির
মুখে পড়েছেন খামারিরা। সর্বশেষ কোভিড-১৯ মহামারিতে বিপর্যস্ত হন তারা। তারপর আবার ঘুরে
দাঁড়ালেও এখন চলছে মন্দার হানা। বিক্রয়মূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন
খামারিরা।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বিশ্বমন্দার এই সময় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে
তারা। কারণ উৎপাদনমূল্য থেকে কম দামে মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। দেশে পোল্ট্রি মাংস
উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে যুক্ত আছে বড় সাতটি প্রতিষ্ঠান। দেশে ছোট-বড় মিলে পোল্ট্রি
খামার রয়েছে (বাণিজ্যিক খামার) ২ লাখ ৫ হাজার ২৩১টি। নিবন্ধিত খামার ৮৭ হাজার ২৭৩টি।
চলতি মাসে নতুন করে আরও ১৫২টি খামার নিবন্ধন নিয়েছে। সপ্তাহে এখন ১ কোটি ৬০ লাখ মুরগি
উৎপাদন হচ্ছে জানিয়ে সংগঠনটি বলছে, প্রয়োজনে আরও খামার বৃদ্ধি করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক
বাজারে পথ সুগম হলে পোল্ট্রি শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস হতে পারে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল বলছে, বর্তমানে দেশে বৈজ্ঞানিক
পদ্ধতিতে উৎপাদন হচ্ছে মানসম্মত পোল্ট্রি মাংস। একে বহির্বিশ্বে ব্র্যান্ডিং করতে হবে।
পাশাপাশি হালাল সনদ, কোয়ালিটি সনদ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে
আলাদা সনদ নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা প্রয়োজন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, দেশে এখন ৪৫-৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রিশিল্পের
বাজার রয়েছে। জৈবনিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিরাপদ পোল্ট্রিশিল্প গড়ে তুলে মাংস রপ্তানির
জন্য কাজ করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ২০১৯ সাল থেকে উদ্যোগ নিলেও এখনও প্রস্তুত হতে
পারেনি তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, উত্তম পশুপালনচর্চা
আইন এবং মান নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা তৈরি করতে না পারায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাণিজ্যিক
নীতিমালাও পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে রপ্তানিযোগ্য পোল্ট্রি মাংস উৎপাদনে যেতে পারছেন
না খামারিরা। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী ‘পোল্ট্রি প্রসেসিং জোন’ কোথায়
হবে তাও চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
অধিদপ্তর সূত্র বলছে, মাংস রপ্তানির পথ খুলতে গত বছর ‘ইন্টারন্যাশাল ট্রেড উইং’
চালু করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ‘ইউনাইটেড স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের’ অর্থায়নে
‘বাংলাদেশ ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর আওতায় কর্মকর্তাদের
প্রশিক্ষণ, নীতিমালা ও জনবল কাঠামোর খসড়া তৈরি হচ্ছে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চালু হওয়া উইংটির কার্যক্রম এখনও গুছিয়ে আনতে পারেনি
অধিদপ্তর। নেই নিজস্ব জনবল। অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব
দিয়ে চলছে উইংটি। মানবসম্পদ শাখার উপপরিচালক ডা. পল্লব কুমার দত্তকে অতিরিক্ত দায়িত্ব
দিয়ে উইংটির পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে। যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দেশি খামারিদের বাণিজ্য সহজতর করতে কার্যক্রম চলমান আছে।
আশা করছি ২০২৫ সালের মধ্যে ট্রেড উইং কার্যকর হবে।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. এমদাদুল হক তালুকদার আশা করছেন, পোল্ট্রিসহ
মাংস রপ্তানির পথ খুলতে উত্তম পশুপালনচর্চা আইন ও মান নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা কিছুদিনের
মধ্যেই চূড়ান্ত হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ধীরে ধীরে রপ্তানির দিকে অগ্রসর হচ্ছি। মাংসে
আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিছু মানদণ্ড পূরণ করতে হবে শুধু। এরপরই রপ্তানিতে যাব।’
এদিকে পোল্ট্রি প্রসেসিং জোন কোথায় হবে তা সরকার এখনও ঠিক করতে পারেনি। এ নিয়ে
সম্প্রতি বৈঠক করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সেখানে আলোচনায় উত্তরবঙ্গের কয়েকটি
জেলা, বরিশাল অঞ্চল ও তিন পাবর্ত্য জেলার নাম প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলকে
উপযুক্ত স্থান ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেক খামার গড়ে
উঠেছে এবং সেখানে ভাইরাসের প্রার্দুভাবও রয়েছে। পার্বত্য এলাকা সেই অর্থে নিরাপদ। বাংলাদেশ
পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ‘বৈঠকে আমরা
বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেছি। এখন উৎপাদন খরচ কমানো, নীতিমালা প্রণয়নসহ প্রসেসিং জোনের
যে সংকট আছে তা সমাধান হলে অচিরেই রপ্তানি শুরু করা যাবে।’
সব সংকট দ্রুত সমাধান করা হবে জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ. ম রেজাউল
করিম বলেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যেই মান নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। আন্তর্জাতিক
বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে একেক দেশের প্রস্তুতি, পূর্ব অভিজ্ঞতা, প্রেক্ষাপট এবং আইন
ও নীতিমালা ভিন্ন। সরকার চেষ্টা করছে নিজস্ব একটি নীতিমালা তৈরি করতে। সেই লক্ষ্যে
কাজ চলছে।