জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:৩৯ পিএম
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:০৬ পিএম
ঋণ অবলোপনে সরকারি ব্যাংকগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। গত ২০ বছরে ৬০ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা অবলোপনকৃত ঋণের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংগুলোর ৩৫ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা। বিপরীতে সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ২৩ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণের তুলনায় আদায় অতি নগণ্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ব্যাংক পরিচালকদের সুবিধা দেওয়ার কারণেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণ অবলোপন অনেক বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজার ৭৮১ কোটি ৫১ লাখ টাকার ঋণ অবলোপনের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার ২২৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৩৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা অবলোপনের বিপরীতে ১১ হাজার ২১১ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে রাষ্ট্রায়্ত্ত ব্যাংকগুলো ২৩ হাজার ২১২ কোটি টাকা অবলোপন করলেও আদায় করেছে মাত্র ৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটাও ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার একটি অংশ। দীর্ঘদিন থেকেই অনেক খেলাপিকে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এ জন্য ব্যাংকের ঋণখেলাপি, পুনঃতফসিল ও অবলোপন বেড়েই চলেছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণ ও তদারকির অভাব এবং অপর্যাপ্ত জামানত বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে এই সুবিধা নিয়েছেন ব্যাংকের পরিচালকরা।
তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে আইনের যথাযথ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে কুঋণের অঙ্ক দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ব্যাংকের অন্যায়-অনিয়ম বাড়ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংক ও শেয়ারহোল্ডাররা।
অনাদায়কৃত খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিট (স্থিতিপত্র) থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বলে। তবে অবলোপন করলেও ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ কমে আসছে। কারণ এ সময়ে ঋণ পুনঃতফসিলের অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ৩২৮ কোটি টাকা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দিয়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের মাত্র ২ লাখ টাকা অবলোপন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংক ১৭ কোটি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ৩৩ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে।
হিসাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে আগের অবলোপন থেকে আদায় হয়েছে ১৮২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুল অঙ্কের এই অবলোপনের বিপরীতে আদায়ের পরিমাণ খুবই নগণ্য। তাই ঋণ বিতরণের আগে গ্রাহকের স্বার্থ যাচাই ও বিতরণের পর সময় সময় খোঁজ নেওয়ার বিকল্প নেই।
২০১৯ সালে ঋণ অবলোপনের নীতিমাল পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো মাত্র তিন বছর পর মন্দমানের খেলাপি ঋণ অবলোপন করে ব্যালান্সশিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দিতে পারছে। আবার অবলোপন করার জন্য আগের মতো শতভাগ প্রভিশন লাগছে না। ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনে মামলা করতে হচ্ছে না।
এর আগে কোনো ঋণ মন্দমানে শ্রেণিকৃত হওয়ার পাঁচ বছর পূর্ণ না হলে তা অবলোপন করা যেত না। মামলা না করে অবলোপন করা যেত ৫০ হাজার টাকা। আর শতভাগ প্রভিশন বা ওই ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা লাগত।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট বিতরণ করা ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। সে হিসাবে বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশই খেলাপি। তিন মাসের ব্যবধানে ৯ হাজার ১৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে খেলাপি ঋণ।
খেলাপি ঋণের মধ্যে ৬৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেশের বেসরকারি ব্যাংকের। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।