এক্সপ্লেইনার
আহমেদ তোফায়েল। ফাইল ছবি
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। এই খাতের অভিভাবক ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনা—সবখানেই এই সংগঠন নেতৃত্ব দেয়।
কিন্তু ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠনটি দীর্ঘ ২১ মাস ধরে নেতৃত্বহীন। সেখানে কোনো নির্বাচিত ব্যবসায়ী নেতৃত্ব নেই। দীর্ঘ সময় আমলাতান্ত্রিক প্রশাসকদের মাধ্যমে সংগঠনটির কাজ চালানো হয়েছে।
তবে গত দুই সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি আরও সঙ্গিন হয়ে উঠেছে। বিদায়ী প্রশাসকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে এফবিসিসিআই এখন পুরোপুরি অভিভাবকশূন্য।
বর্তমান সরকার অর্থনীতি চাঙা করতে একের পর এক নীতিসহায়তা দিচ্ছে। নতুন নতুন প্রণোদনা তহবিল চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি খাতের এই প্ল্যাটফর্মটি এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।
এই স্থবিরতা দেশের অর্থনীতি ও নীতি কাঠামোর জন্য মস্ত বড় ধাক্কা। এটি সার্বিকভাবে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ক্ষতি করছে।
যেভাবে সংকটের শুরু
এই সংকটের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এফবিসিসিআইয়ের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের পদত্যাগের দাবি ওঠে। সাধারণ সদস্যদের একাংশ এই দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করেন। এরপর ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ফেডারেশনের পর্ষদ বাতিল করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য মো. হাফিজুর রহমানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের হাতে নেতৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন রূপ নেয়। হাফিজুর রহমান এক বছর দায়িত্ব পালন করেও নির্বাচন করতে পারেননি।
যদিও তার মেয়াদে একটি নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার কিছু ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যবসায়ীদের একাংশ আদালতে রিট করেন। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি আটকে যায়। এরপর শুরু হয় আমলা বদলের খেলা।
দ্বিতীয় দফায় প্রশাসক হন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান। চার মাসের মধ্যে তাকে নির্বাচন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু আইনি জটিলতার বেড়াজাল তিনি টপকাতে পারেননি। তার বর্ধিত মেয়াদও গত ২৬ জুন শেষ হয়েছে। ফলে এই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানটি আজ শূন্যতায় নিমজ্জিত। সেখানে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো বৈধ কর্তৃপক্ষ নেই।
বিধিমালার ফাঁদ ও আইনি মারপ্যাঁচ
এফবিসিসিআই এবং দেশের অন্যান্য চেম্বারের নির্বাচন আটকে থাকার মূল কারণ একটি বিধিমালা।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের মে মাসে ‘বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা’ জারি করা হয়। নতুন ওই বিধিমালায় একটি বিশেষ শর্ত দেওয়া হয়।
বলা হয়, ফেডারেশনের পরিচালনা পর্ষদে কোনো ব্যক্তি টানা দুবারের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে দুবার দায়িত্ব পালনের পর একবার বিরতি দিয়ে আবার নির্বাচন করা যাবে।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, এই নিয়মটি পেছনের মেয়াদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়। এর ফলে গত দুটি পর্ষদে যারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা হারান।
স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটি বড় ও প্রভাবশালী অংশ এতে ক্ষুব্ধ হয়। এবং বিষয়টি আদালতে গড়ায়।
একটি কার্যকর নির্বাচনি ব্যবস্থার জন্য সংস্কার প্রয়োজন। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সংস্কার বাস্তবতাবর্জিত হলে চলে না। অংশীজনদের ঐকমত্য ছাড়া কোনো নিয়ম চাপিয়ে দিলে তা হিতে বিপরীত হয়।
এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার বা মেট্রোপলিটন চেম্বারের আপত্তির মুখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর থেকে সেই প্রক্রিয়াটিও শ্লথ হয়ে আছে।
ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও গত পাঁচ মাসে এই বিধিমালা সংশোধন হয়নি।
একজন আমলা বা সরকারি কর্মকর্তা যতই দক্ষ হোন না কেন, তিনি ব্যবসায়ী নন। ব্যবসার মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করা তার পক্ষে কঠিন। একজন ব্যবসায়ী যেভাবে বাজারের নিত্যদিনের সংকট বোঝেন, তা একজন আমলা বোঝেন না।
কর ও শুল্ক নীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতা কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি ব্যবসায়ীরাই ভালো জানেন। এই বিষয়গুলো প্রশাসনিক ফাইলের ভেতর থেকে অনুধাবন করা অসম্ভব।
দীর্ঘ ২১ মাস এফবিসিসিআই প্রশাসকের অধীনে রয়েছে। এর ফলে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের কণ্ঠ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহায়ক কমিটির সদস্য আবুল কাশেম হায়দার এ নিয়ে গণমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেছেন, সরকার একদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। অন্যদিকে দুই বছর ধরে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনকে নেতৃত্বহীন করে রেখেছে। যদি এর কোনো প্রয়োজনই না থাকে, তবে তা বিলুপ্ত করে দেওয়াই ভালো। এই চরম হতাশা আজ দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের।
বিশেষ করে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার। বড় বড় করপোরেট হাউসগুলো সরাসরি সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের বা ছোট খাতের ব্যবসায়ীদের একমাত্র ভরসা এফবিসিসিআই বা স্থানীয় চেম্বার।
সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিনের ভাষায়, “যত দ্রুত সম্ভব ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনকে সচল করা দরকার। তা না হলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সরকারের কাছে পৌঁছাতে পারবেন না।”
বর্তমান সরকার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে চায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে আন্তরিক চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতি কেবল সরকারের একক সিদ্ধান্তে চলে না। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব অপরিহার্য।
এফবিসিসিআই যখন অভিভাবকহীন থাকে, তখন বড় ক্ষতি হয়। বাজেট প্রণয়ন বা আমদানি-রপ্তানি নীতি নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের প্রকৃত এজেন্ডাগুলো বাদ পড়ে যায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাতেও স্থবিরতা আসে।
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, বেসরকারি খাত থেকে একজন যোগ্য ব্যবসায়ীকে প্রশাসক হিসেবে খোঁজা হচ্ছে। তার অধীনেই দ্রুত নির্বাচন দেওয়া হবে। এই উদ্যোগটি ইতিবাচক।
তবে প্রশ্ন থাকে—এই যোগ্য ব্যক্তি খোঁজার প্রক্রিয়ায় এত দীর্ঘ বিলম্ব কেন হচ্ছে?
করণীয় কী
এফবিসিসিআইকে এই সংকট থেকে বের করে আনতে হবে। এর জন্য সরকারকে দ্রুত সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন- সরকারি আমলার পরিবর্তে বেসরকারি খাতের একজন যোগ্য ব্যবসায়ীকে প্রশাসক নিয়োগ করতে হবে। তিনি হবেন সর্বজনগ্রাহ্য ও নিরপেক্ষ। তার মূল লক্ষ্য হবে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।
যে বিধিমালাকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা সংশোধন করতে হবে। ব্যবসায়ী ও আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে অবিলম্বে একটি যৌক্তিক সমাধান করতে হবে। সংস্কারের নামে এমন কোনো ধারা চাপানো উচিত নয় যা আইনি বিরোধ তৈরি করে।
এছাড়া উচ্চ আদালতে কিছু রিট মামলা ঝুলে আছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হয়ে এই মামলাগুলোর নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর থেকে আইনি স্থগিতাদেশ উঠে যাবে।
শুধু এফবিসিসিআই নয়, ঢাকার বাইরের জেলা চেম্বারগুলোতেও নির্বাচনী জট খুলতে হবে। বিভিন্ন খাতের অ্যাসোসিয়েশনগুলোতেও নির্বাচন প্রয়োজন। বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। এগুলোকে খাঁটি ব্যবসায়ীদের সংগঠনে রূপান্তর করা জরুরি।
পরিশেষে, একটি শক্তিশালী ও গতিশীল অর্থনীতির জন্য স্বাধীন ব্যবসায়ী সংগঠন অপরিহার্য। এফবিসিসিআইকে আর একদিনও অভিভাবকহীন রাখা ঠিক হবে না। একে আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে বন্দি রাখা সমীচীন নয়।
বিনিয়োগের খরা কাটানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এই সংগঠনটি জরুরি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে দেশের বেসরকারি খাতের এই প্রধান স্তম্ভটিকে সচল করতে হবে।
আশা করা যায়, বর্তমান সরকার আর কালক্ষেপণ করবে না। দ্রুত একজন ব্যবসায়ী প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে এফবিসিসিআইয়ের গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে।
এর মাধ্যমেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই অভিভাবকত্ব সংকটের স্থায়ী অবসান ঘটবে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ