চট্টগ্রাম বন্দর
সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৬ এএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১৬:২০ পিএম
চট্টগ্রাম বন্দরে দেড় মাসেরও বেশি সময় কটি ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাস না হওয়ায় জমা হয়েছে বিপুল পরিমাণ স্টোরেজ চার্জ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। তবুও খালাস হচ্ছে না আমদানিকৃত কাঁচামাল। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অনড় অবস্থানের কারণে গভীর সংকটে পড়েছে একটি ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান। হাইকোর্ট সাত দিনের মধ্যে পণ্য ছাড়ের আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে দেড় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বন্দরে জমা হয়েছে বিপুল পরিমাণ স্টোরেজ চার্জ। একই সঙ্গে বেড়েছে কনটেইনার ডেমারেজ। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ পণ্যের ঘোষিত মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি ভিন্ন। তারা প্রচলিত আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করতেই এই বিলম্ব হয়েছে বলে জানিয়েছে।
ব্যবসায়ী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি প্রশাসনিক জটিলতার একটি বাস্তব উদাহরণ। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কীভাবে পুঁজি হারান, তা এখানে স্পষ্ট। কাস্টমসের আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে একই কাস্টমস ইউনিটে আরও পাঁচটি চালান আটকে ছিল। এর মধ্যে বম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের ২২ টন ব্ল্যাক সল্টের একটি চালানও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গত ২১ এপ্রিল বিল অব এন্ট্রি দাখিল করলেও চালানটি খালাস পেতে ১৪ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানটির নাম ওয়ার্দা অ্যান্ড জুবায়ের অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর এই খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানটি হিমালয়ান পিংক সল্ট আমদানি করে। এটি দিয়ে তারা হিমায়িত খাদ্য ও স্ন্যাকস উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটির বিডা ও বিএসটিআইয়ের বৈধ অনুমোদন রয়েছে। তারা বছরে ৭০০ টন রক সল্ট আমদানির অনুমতিও পেয়েছে। গত দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৮৬ টন লবণ আমদানি করেছে। প্রতিটি চালান মাত্র ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ছাড় পেয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তান থেকে ২৮ টন রক সল্ট আমদানির পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ৪ মে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করলেও চালানটি ছাড় দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে আমদানিকারক ২০ মে হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত পরদিন সাত দিনের মধ্যে চালানটি ছাড়ের নির্দেশ দেন।
আমদানিকারকের অভিযোগ, হাইকোর্টের নির্দেশ কাস্টমস বাস্তবায়ন করেনি। উল্টো তারা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র বা এনওসি জমা দেওয়ার নতুন শর্ত দেয়। গত ২৪ মে আদালতের আদেশের অনুলিপি জমা দিতে গেলে ছুটির অজুহাতে তা নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে ১ জুন আদেশটি গ্রহণ করা হয়। ওই দিনই সহকারী কমিশনার তৌহিদা ইসলামের সই করা একটি চিঠি আমদানিকারককে দেওয়া হয়। সেখানে এনওসি ছাড়া চালান ছাড় না করার কথা বলা হয়। চিঠিটি আমদানিকারকের হাতে পৌঁছায় ৭ জুন। অর্থাৎ আদালতের আদেশের ১৬ দিন পর নতুন শর্তের কথা জানানো হয়। এই সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার টাকা করে স্টোরেজ চার্জ ও ডেমারেজ বাড়তে থাকে।
আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বড় মতবিরোধ রয়েছে। কাস্টমসের দাবি, জাতীয় লবণ নীতিমালা ও আমদানি নীতিমালা অনুযায়ী শিল্পের লবণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। আমদানিকারক প্রয়োজনীয় সনদ দাখিল করতে পারেননি। অন্যদিকে আমদানিকারকের দাবি, তারা নির্দিষ্ট এইচএস কোডের আওতায় খনিজসমৃদ্ধ রক সল্ট এনেছেন। এটি সাধারণ শিল্প লবণের আওতায় পড়ে না। তাছাড়া এর আগে একই ধরনের সাতটি চালান কোনো এনওসি ছাড়াই খালাস হয়েছে। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই কর্মকর্তার অধীনে দুটি চালান মাত্র সাত দিনে ছাড় পেয়েছিল।
নির্ধারিত সময়ে পণ্য ছাড় না পেয়ে আমদানিকারকের আইনজীবী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠান। এর জবাবে কাস্টমস জানায়, তারা হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২ জুলাই আবেদনটি নিষ্পত্তি করেন। তবে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশে কোনো স্থগিতাদেশ দেননি। এরপর ৭ জুলাই আপিল বিভাগের আদেশের কপি নিয়ে কাস্টমসে যাওয়া হয়। কিন্তু কাস্টমসের যোগাযোগ শাখা প্রথমে সেই নথি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নথি অনুযায়ী, কাঁচামালের চালানটি মোট ৬৫ দিন ধরে বন্দরে আটকে আছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ অনুযায়ী স্টোরেজ চার্জ ও ভ্যাট বাবদ ব্যয় হয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৪০ টাকা। এর মধ্যে শুধু পেনাল স্টোরেজ চার্জই ৭ লাখ ১৮ হাজার ২০০ টাকা। এছাড়া ৫৩ দিনের কনটেইনার ডেমারেজ বাবদ শিপিং লাইনের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৬০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ১৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ আমদানি নথি অনুযায়ী চালানটির ঘোষিত মূল্য ছিল মাত্র ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। শুল্ক, ভ্যাট ও আইনি ব্যয় যোগ করলে মোট ক্ষতি পণ্যের মূল্যের দ্বিগুণ হবে।
কাঁচামাল দীর্ঘদিন বন্দরে আটকে থাকায় কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই বিষয়ে সহকারী কমিশনার তৌহিদা ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র জানান, আমদানি নীতিমালার কিছু অস্পষ্টতার কারণে এই জটিলতা হয়েছে। কাস্টমসের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না।