একই সঙ্গে বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা পোশাক শিল্পের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেশভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
এ সময় দেশের মোট পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এই খাতের সামান্য নেতিবাচক প্রবণতাও সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
তৈরি পোশাকের দুটি প্রধান উপখাত নিটওয়্যার ও ওভেন উভয় ক্ষেত্রেই রপ্তানি কমেছে। নিটওয়্যার রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে সামান্য কমে ১৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নেও রপ্তানি আয় কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কম। এর ফলে দেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে ইউরোপের অংশীদারত্বও কমে ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এই প্রথম ইউরোপের অংশ মোট রপ্তানির অর্ধেকের নিচে নেমে গেল।
তবে সব বাজারে একই চিত্র দেখা যায়নি। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ফলে এ বাজার থেকে আয় বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে মোট রপ্তানি আয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশও বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যেও সামান্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সেখানে রপ্তানি বেড়ে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কানাডার বাজারেও ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চিত্রও ছিল ভিন্নধর্মী। জার্মানি এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় বাজার হলেও সেখানে রপ্তানি ১১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে গেছে। ফ্রান্স ও ইতালিতেও উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। অন্যদিকে স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডে রপ্তানি বেড়েছে। অর্থাৎ একই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।
প্রচলিত বাজারের বাইরে যেসব দেশে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করে, সেসব অপ্রচলিত বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়নি। এসব বাজারে মোট রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে মোট পোশাক রপ্তানিতে এ বাজারগুলোর অংশও কিছুটা কমেছে।
অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে জাপান এখনও সবচেয়ে বড় গন্তব্য। তবে সেখানেও রপ্তানি কমেছে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া এবং রাশিয়ার বাজারেও রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ার বাজারে পতনের হার ছিল সবচেয়ে বেশি।
শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, সার্বিক রপ্তানি হ্রাসের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা চাপের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে, ভারত ও ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ায় তারা প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
দেশীয় পরিস্থিতিও শিল্পের জন্য অনুকূল ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারেনি। এতে উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে পোশাক ও বস্ত্র খাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমেছে, যা নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি, বিদ্যুতের দাম বারবার বৃদ্ধি এবং প্রতি বছরের মজুরি সমন্বয়ের চাপ মিলিয়ে অনেক উদ্যোক্তা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এর ফলে অনেক কারখানা লোকসানের মুখে পড়েছে এবং কিছু কারখানা কার্যক্রমও বন্ধ করে দিয়েছে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তার মতে, বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা দুর্বল রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ক্রেতারা সে অনুযায়ী দাম দিচ্ছেন না। সুতরাং, রাসায়নিক, জ্বালানি ও শ্রম ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক কারখানার লাভ কমে গেছে কিংবা তারা লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। এটিও সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অপ্রচলিত বাজার প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “২০২৪ সালে এসব বাজারের মোট আকার ছিল প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। অথচ সেখানে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ৬ শতাংশ। তার মতে, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারে আরও বড় সুযোগ রয়েছে। নতুন বাজার এবং নতুন পণ্যে ধারাবাহিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে”।