২০২৫-২৬ অর্থবছর
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের পুঁজিবাজারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি লেনদেন হওয়ায় বিদেশি শেয়ার লেনদেন চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে লেনদেন বাড়লেও বাজারে বিদেশি মূলধনের নিট প্রবাহ ইতিবাচক হয়নি।
বরং পুরো অর্থবছরজুড়েই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেনার চেয়ে বেশি শেয়ার বিক্রি করেছেন, ফলে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৪৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি লেনদেন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি লেনদেনের পরিমাণ ২০২১-২২ অর্থবছরের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।
তবে এই পরিসংখ্যান বাজারের জন্য পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বছরের অধিকাংশ সময় নিট বিক্রেতা হিসেবে অবস্থান করেছেন। অর্থাৎ তারা যত টাকা দিয়ে শেয়ার কিনেছেন, তার চেয়ে বেশি মূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছেন। এতে দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি মূলধনের বহির্গমন অব্যাহত থেকেছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থবছরের শুরুতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণে বড় প্রভাব ফেলেছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানা উদ্বেগের কারণে নির্বাচনের আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। পরে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও আগ্রহ দেখা দেয়। সে সময় বাজারে তাদের অংশগ্রহণও বাড়তে শুরু করে।
কিন্তু এই ইতিবাচক প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও। ডিএসইর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংঘাত শুরুর পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবারও বিক্রির দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিশেষ করে জুন মাসে তাদের বিক্রির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে নির্বাচনের পর যে ইতিবাচক গতি তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই স্তিমিত হয়ে পড়ে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলামও মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বাড়লেও বিক্রির পরিমাণ এখনও কেনার চেয়ে বেশি। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিক্রির চাপ কিছুটা কমেছে, তবু তা পুরোপুরি কাটেনি। তার মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে জ্বালানির দামের সম্ভাব্য অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই কারণে তারা ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ সীমিত করেছেন। তবে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিদেশি অংশগ্রহণ আবার বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে মূলধনী মুনাফা কর এবং সেই কর নির্ধারণের বর্তমান পদ্ধতি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এ বিষয়ে ডিবিএ একাধিকবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। নতুন চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া কমিশন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিলে বাজারে আস্থা ফিরতে পারে বলেও মনে করেন তারা।
বাজারসংশ্লিষ্ট এক জ্যেষ্ঠ ব্রোকারেজ কর্মকর্তা জানান, শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ার আরও কয়েকটি বাজার থেকেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন। তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে মূলধন সরিয়ে তারা উন্নত ও কঠোর নিয়ন্ত্রিত বাজারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একই ধরনের প্রবণতা ভারতে দেখা গেছে, যেখানে ২০২৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রেকর্ড পরিমাণ মূলধন প্রত্যাহার করেছেন।
এর আগে মে মাসেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি মূলধন বহির্গমন নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। ওই মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১৬১ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেন, বিপরীতে নতুন করে কেনেন মাত্র ৬ কোটি টাকার শেয়ার। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বিক্রির এই চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল ব্লু-চিপ ও মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ারে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা তুলনামূলক নিরাপদ ও অধিক তারল্যসম্পন্ন সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে বাংলাদেশের মতো সীমান্তবর্তী বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ এখনও সীমিত রয়েছে।