আঙ্কটাডের প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১৯:৩৪ পিএম
ছবি: রয়টার্স
টানা দুই বছর পতনের পর দেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বইছে সুবাতাস। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৪৫ শতাংশ।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের বার্ষিক প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.৭৮ বিলিয়ন (১৭৮ কোটি) মার্কিন ডলারে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে দেশে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১.২৩ বিলিয়ন (১২৩ কোটি) ডলার।
এই বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে। এই অঞ্চলে বিনিয়োগের শীর্ষে রয়েছে ভারত। আর সামান্য ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিও কিছুটা গতি পেয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৬ শতাংশ বেড়েছে। মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। তবে এই প্রবৃদ্ধি সব অঞ্চলে সমান নয়। উন্নত দেশগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ ১১ শতাংশ বেড়েছে। সেখানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৭২৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই বৃদ্ধির বড় অংশই ছিল ইউরোপের আর্থিক ও বিনিয়োগ হাবগুলোর মাধ্যমে।
বিপরীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। সেখানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০১ বিলিয়ন ডলারে। উন্নয়নশীল অঞ্চলের মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোই বরাবরের মতো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভারতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে এগিয়ে গেছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬.১ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছর এই পরিমাণ ছিল ৩৪.১ বিলিয়ন ডলার। ভারত এই অঞ্চলে নিজের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রেখেছে। দেশটি ২০২৫ সালে ৩৮.৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি। ভারতের উৎপাদন খাত, সেবা খাত এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বহুমুখীকরণের কারণে এই বড় সাফল্য এসেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ২০২৫ সালে ১.৮৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে। তাদের বিনিয়োগ আগের বছরের চেয়ে কমলেও তা বাংলাদেশের চেয়ে সামান্য বেশি ছিল। ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ তার পর্যটন খাতের ওপর ভর করে ৮৫৭ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘরে তুলেছে। তবে নেপাল ও ভুটানের মতো দেশগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল বেশ কম।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলো এখন ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শিল্প খাত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নতুন কিছু খাতে বিনিয়োগের তীব্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তি।
এশিয়ার অনেক দেশেরই শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষ সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। তবে এই সুবিধাগুলো সব দেশের জন্য সমান নয়। বৈশ্বিক পুঁজি পাওয়ার এই লড়াই দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। চীনের মতো বড় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কিছুটা কমে ১০৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তা সত্ত্বেও তারা গবেষণা ও উন্নয়ন এবং ওষুধ শিল্পের মতো উচ্চ মূল্যের খাতে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের এই নতুন অধ্যায়ে টিকে থাকাটাই এখন দেশগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা। জাতিসংঘের সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে যে আগামী দিনে বিনিয়োগ পাওয়া আরও কঠিন হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এখন নিজস্ব শিল্প নীতি ব্যবহার করছে। তারা উন্নত প্রযুক্তির প্রকল্পগুলো নিজেদের দেশে টানার চেষ্টা করছে।
এদিকে বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি খাটানোর ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন। ফলে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ কেবল বিদেশি বিনিয়োগ আনা নয়। বরং সেই বিনিয়োগকে কীভাবে নিজেদের শিল্পের আধুনিকায়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সরবরাহকারী ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায় তা নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব বিনিয়োগের সামগ্রিক পূর্বাভাসকে এখনো মেঘাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য এই ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি বড় স্বস্তি। তবে ভবিষ্যতের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এই ধারা বজায় রাখতে হবে। এর জন্য কৌশলগত নীতি নির্ধারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প খাতে মনোযোগ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।