ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের বেসরকারি খাতে মন্দার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় থমকে গেছে। বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। এর মধ্যে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।তবে এই উদ্যোগও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে এই চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বনিম্ন মাসিক প্রবৃদ্ধি। এর আগের দুই মাসে প্রবৃদ্ধি আরও কম ছিল। গত মার্চে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর এপ্রিলে ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মূলত ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে আটকে আছে। এই ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তারা আশা করেছিল জুন নাগাদ এই প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ হবে। কিন্তু প্রকৃত অর্জন ছিল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।
বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের এখন চরম অনীহা। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে। তাই ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতারাও নানাবিধ সংকটের কারণে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ঋণক্ষুধা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চলমান জ্বালানি সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তহবিলের উচ্চ খরচ বা ঋণের চড়া সুদহার। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ধাক্কাও ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। সংকটে পড়া ব্যবসায়ীরা বকেয়া ঋণের মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে অনেক ব্যবসায়ী এই ২ শতাংশ টাকা পরিশোধেও সমস্যায় পড়েন। তাই গত ফেব্রুয়ারি মাসে ডাউন পেমেন্টের এই নিয়ম আরও শিথিল করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অনুমোদনের সময় নির্ধারিত অঙ্কের অর্ধেক টাকা দিতে হবে। বাকি অর্ধেক টাকা পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করা যাবে। তবে এত সুবিধা দেওয়ার পরেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গতি পায়নি।
অবশ্য আগামী দিনগুলোতে ঋণের চাহিদা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ওই কর্মকর্তা। বিনিয়োগ বাড়াতে গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এর সুফল পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ঋণের খরচ কমানোর একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মাসে আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ৩০ জুন নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান একটি প্রক্ষেপণ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, গত জুন নাগাদ বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
বর্তমান বৈরী ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির কারণে উদ্যোক্তারা বাজারে টিকে থাকতে লড়াই করছেন। এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ খরচ এবং ব্যবসা-প্রতিকূল কর নীতিকে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা কেউ ভাবার সাহস পাচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কীভাবে হলো? কারা এই ঋণ নিচ্ছেন এবং তারা আদৌ এই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) এবং ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকারও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগকারীরা এখন অর্থ খাটাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ এখন চরম অনিশ্চিত। দিনশেষে শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপরিহার্য। এই মৌলিক উপাদানের অভাবে সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ছে।
তবে তিনি একটি বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সব ধরনের সমন্বিত সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যারা বাইরে কারখানা স্থাপন করেছেন, তারা এই সুবিধা পাচ্ছেন না। এতে দেশি শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষাতেও সরকারের নজর দেওয়া উচিত।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এলসি খোলার বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এলসি খোলার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে ঋণের চাহিদা এখন খুব কম। তাই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তারা ট্রেজারি বিল এবং বন্ডে টাকা খাটিয়ে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছে। এই অভিজ্ঞ ব্যাংকারের মতে, দেশ মূলত ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতির দিকে যাচ্ছে। এখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর এবং একই সাথে মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ জানান, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে উদ্বেগের বিষয়। অতীতে এই প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে ছিল। এখন তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক একটি স্তর। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারের কাজ খুব কম হয়েছে। ফলে ব্যবসায়িক পরিবেশ সামগ্রিকভাবে দুর্বল হয়েছে। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাম্প্রতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও বেশি নাজুক করে তুলেছে।
সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতের ঋণের এই নিম্নমুখী ধারা দেশের কর্মসংস্থান তৈরি ও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় বাধা। সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ সাময়িকভাবে ব্যাংকের মুনাফা বাড়াচ্ছে। কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল খাতের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানির টেকসই সমাধান, কর কাঠামোর সংস্কার এবং দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থনীতিকে গতিশীল করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।