সৌরভ হোসেন
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ০৯:৪০ এএম
গ্যাসের দাম সরকার কমালেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। ছবি: সংগৃহীত
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বা এলপি গ্যাসের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
জুলাই মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে সেই মূল্য কার্যকর হতে দেখা যায়নি। বিভিন্ন এলাকায় ঘোষিত দামের চেয়ে ২২২ থেকে ২৭২ টাকা বেশি দরে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
গত রবিবার রাজধানীর শান্তিনগর, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকার অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি এলপিজি বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে ১২ কেজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৫০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো দোকানেই সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫২৮ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়নি। যদিও বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক বলে বিক্রেতারা জানান।
শান্তিনগরের খুচরা বিক্রেতা মো. জয়নাল বলেন, তারা এখনও কোম্পানির কাছ থেকে নতুন দামে সরবরাহ পাননি। আগের বেশি দামে কেনা সিলিন্ডার ঘোষিত দামে বিক্রি করলে লোকসানে পড়তে হবে। তাই পুরনো মজুদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ১ হাজার ৭৫০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন। নতুন চালান এলে নতুন মূল্য কার্যকর করবেন বলে জানান তিনি।
তবে এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নন ভোক্তারা। শান্তিনগরের ক্রেতা মো. মুকিদুল হক বলেন, সরকার দাম কমালেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। দোকানিরা আগের দামই নিচ্ছেন। তার অভিযোগ, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাবে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
রামপুরা ও বাড্ডা এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাড্ডার ব্যবসায়ী মো. জোনায়েত জানান, তিনি আগের দামে সিলিন্ডার কিনেছেন। তাই ওমেরা ব্র্যান্ডের ১২.৫ কেজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ টাকায় এবং এসএন গ্যাসের ১২ কেজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় ২২২ থেকে ২৭২ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
বাড্ডা বাজারের ক্রেতা আল-আমিন বলেন, প্রতিবার মূল্য কমানোর ঘোষণা এলেও বাস্তবে সেই সুবিধা পাওয়া যায় না। একই বাজারের ক্রেতা মরিয়ম আক্তার বলেন, টেলিভিশনে দাম কমার খবর দেখলেও দোকানে এসে আগের দামই দিতে হয়েছে।
বিইআরসি জানিয়েছে, নতুন মূল্য ২ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে এবং লাইসেন্সধারী সব এলপিজি বিপণন কোম্পানির জন্য তা বাধ্যতামূলক। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত মূল্যের বেশি দামে এলপিজি বিক্রির সুযোগ নেই।
এদিকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি)-এর সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন মূল্য কার্যকর করতে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে সমন্বয় প্রয়োজন। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পুরনো দামে কেনা মজুদ থাকলে নতুন মূল্য বাজারে কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নেই বলেও তারা মত দেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘোষিত মূল্য বাস্তবায়নে দুর্বল নজরদারি অন্যতম প্রধান বাধা। বিক্রেতারা পুরনো মজুদের কথা বললেও বাজারে নতুন মূল্য কার্যকর নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হলেও সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছে না। সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়ের অভাব এবং কার্যকর তদারকির ঘাটতির কারণে ঘোষিত মূল্য বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে এলপিজিনির্ভর লাখো পরিবার মূল্যহ্রাসের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ থাকলেও সরেজমিন কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালত বা তদারকির কার্যক্রম দেখা যায়নি। ভোক্তাদের অভিযোগ, মূল্য ঘোষণার পর প্রথম কয়েক দিন অতিরিক্ত দাম আদায়ের প্রবণতা বেশি থাকলেও ওই সময় নজরদারি তুলনামূলক কম থাকে। তাদের প্রশ্ন, সরকার নির্ধারিত দামে যদি এলপিজি বাজারে না-ই পাওয়া যায়, তবে মূল্য কমানোর ঘোষণার কার্যকারিতা কোথায়?