আহমেদ তোফায়েল; বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের বড় নির্দেশক হলো রপ্তানি আয়। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এটি আরও সত্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কর্মসংস্থান—দুই খাতেই এর ভূমিকা মুখ্য। কিন্তু সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রপ্তানি চিত্র আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে না।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ঠিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারের।
অঙ্কটি বড় মনে হলেও এর ভেতরের খবর ভালো নয়। এটি আগের অর্থবছরের চেয়ে ২০ কোটি ডলার বা শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অন্য জায়গায়। বিদায়ী অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই রপ্তানি কমেছে। কেবল এপ্রিল ও জুনে কিছু প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তবে তা পুরো বছরের মন্দা ঢাকতে পারেনি। বছরজুড়েই খাতটি গতিহীন ছিল।
প্রশ্ন উঠেছে, এই মন্দা কি কেবলই বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফল? নাকি এর পেছনে আমাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী? এই স্থবিরতার কারণ খোঁজা এখনই সময়।
আমাদের রপ্তানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে অতীতের দিকে তাকাতে হবে। বিগত কয়েক বছর ধরে রপ্তানি আয়ের বিশাল চিত্র আমরা দেখছিলাম। কিন্তু তার পেছনে বড় ধরনের হিসাবের গরমিল ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির সংশোধিত হিসাবে তা প্রমাণিত হয়েছে।
সংশোধিত হিসাব বলছে, বিগত ১০ বছরে রপ্তানি আয় প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার বেশি দেখানো হয়েছিল। কাগজের এই হিসাব নীতিনির্ধারকদের এক ধরনের মিথ্যা স্বস্তি দিয়েছিল।
প্রকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এখন যে চিত্র এসেছে, তা বেশ উদ্বেগজনক। বিদায়ী অর্থবছরের ৪ হাজার কোটি ডলারের বিপরীতে আগের বছর প্রকৃত রপ্তানি ছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার।
তার আগের বছরগুলোতেও আয় ওঠানামা করেছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, আমাদের রপ্তানি খাত একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে আটকে গেছে। ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলারের যে রেকর্ড আমরা ২০২১-২২ অর্থবছরে দেখেছিলাম, তা মূলত তথ্যের ফানুস ছিল।
এখন আমরা রুক্ষ বাস্তবতার মুখোমুখি। আমাদের বাণিজ্য নীতিকে এখন নতুন করে সাজাতে হবে। কৃত্রিম হিসাব বাদ দিয়ে প্রকৃত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ভূরাজনীতি ও শুল্কযুদ্ধের ধাক্কা
বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানির শ্লথগতির পেছনে একটি বড় আন্তর্জাতিক কারণ ছিল। তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি ও বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধ।
অর্থবছরের শুরুতে রপ্তানি ভালোই ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মাস আগস্ট থেকে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। এর মূলে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার নিয়ে অনিশ্চয়তা।
একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক বসে। পরবর্তীতে তা ২০ শতাংশে নামে। এই শুল্কের ধাক্কা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের বড় সংকটে ফেলে।
তবে চ্যালেঞ্জটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর একটি পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে ইউরোপের বাজারে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন চীন ও ভারতের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে, তখন ওই দেশগুলো বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করে। বিশেষ করে চীন ও ভারত তাদের পণ্য নিয়ে ইউরোপের বাজারে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে।
এই দেশগুলোর লজিস্টিকস সাপোর্ট এবং উৎপাদন খরচ আমাদের চেয়ে কম। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কযুদ্ধের কারণে এভাবে পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।
একক পণ্যের ওপর অতি-নির্ভরতার ঝুঁকি
বিদায়ী অর্থবছরের উপাত্ত আমাদের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা দেখিয়েছে। তা হলো তৈরি পোশাক খাতের ওপর আমাদের অতি-নির্ভরতা।
মোট ৪৮ বিলিয়ন ডলারের আয়ের মধ্যে এককভাবে তৈরি পোশাক থেকেই এসেছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। বাকি চামড়া, কৃষি, পাট, হোম টেক্সটাইল ও প্রকৌশল পণ্য মিলে আয় করেছে মাত্র ৯৩০ কোটি ডলার।
অর্থাৎ, মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি আসছে একটি মাত্র খাত থেকে।
একটি মাত্র খাতের ওপর এতটা নির্ভরশীল হওয়া অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক। বৈশ্বিক বাজারে সামান্যতম সমস্যা হলেই পুরো অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে।
বিদায়ী অর্থবছরে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আগের বছরের চেয়ে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। আর এই সামান্য হ্রাসের কারণেই সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মাইনাস হয়ে গেছে।
পোশাক খাত আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের সমীকরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। কেবল এক ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে টিকে থাকা কঠিন। পোশাক খাতের এই পতনই প্রমাণ করে, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে আমাদের উদ্যোগ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল।
আমাদের ঘরের দুর্বলতা
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো সমাধান করার দায়িত্ব আমাদেরই।
তৈরি পোশাক খাতের বিশেষজ্ঞরা সঠিকভাবেই কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। রপ্তানি কমার পেছনে আন্তর্জাতিক কারণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কারণগুলোও সমান দায়ী।
প্রথম সমস্যা হলো দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত সরবরাহ এবং লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
অনেক কারখানাকে চড়া মূল্যে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে আমরা ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ছি।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বন্দর ও লজিস্টিকস খাতের দুর্বলতা। চট্টগ্রাম বন্দরসহ প্রধান বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময় লাগে। এই দীর্ঘসূত্রতা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
আধুনিক বিশ্বে ‘লিড টাইম’ বা কত দ্রুত পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে আমাদের লিড টাইম প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি।
তৃতীয়ত, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা পশ্চাৎসংযোগ শিল্পের অভাব। বিশেষ করে নন-কটন পোশাকের কাঁচামালের জন্য আমাদের এখনো আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই পরনির্ভরতা আমাদের পণ্যের মূল্য সংযোজন কমিয়ে দিচ্ছে।
সামগ্রিক হতাশার মাঝেও কিছু খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বিদায়ী অর্থবছরে ৭ শতাংশ বেড়েছে।
এই খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১২৩ কোটি ডলার। সাভার চামড়া শিল্পনগরীর শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা গেলে এই খাতটি আরও বড় হতে পারে।
একইভাবে, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে প্রকৌশল পণ্য খাত।
এই খাতে প্রায় ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৫ কোটি ডলার। হালকা প্রকৌশল ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পের এই অগ্রগতি আমাদের আশা জাগায়।
সঠিক নীতি সহায়তা পেলে এই খাতগুলো বিশ্ববাজারে ভালো করতে পারবে। তবে কৃষিপণ্যের রপ্তানি ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। এই খাতে আমাদের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের আধুনিকায়ন দরকার।
করণীয় কী
৪৮ বিলিয়ন ডলারের এই স্থবিরতা ভাঙতে হলে আমাদের আমূল সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
কিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমনÑ শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একে সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার করা উচিত। প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে হবে।
বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুল্কায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরের জট নিরসন করা জরুরি। এতে লিড টাইম অনেক কমে আসবে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি কাতার থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে। এর পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাবে।
তাই এখনই বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক কমানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
পোশাক খাতের মতো চামড়া, আইটি ও হালকা প্রকৌশল খাতকে নীতি সহায়তা দিতে হবে। কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
চীন, ভারত, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিং বাড়াতে হবে। নতুন নতুন বাজারে নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে।
পরিশেষে, বিদায়ী অর্থবছরের রপ্তানি স্থবিরতা আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তথ্যের অসঙ্গতি দূর করে আমরা এখন প্রকৃত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছি। এখান থেকেই আমাদের নতুন যাত্রা শুরু করতে হবে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সমীকরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বা চীনের বাজার দখলকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে টিকে থাকা যায়, সেই কৌশল আমাদেরই শিখতে হবে।
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও দূরদর্শী বাণিজ্য কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়নই হবে আমাদের আগামী দিনের শক্তি।
সরকার ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যৌথ প্রয়াসই পারে এই স্থবিরতা ভাঙতে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের সঠিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ