চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: বাসস
সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫১ একক বেশি। পাশাপাশি বেড়েছে কার্গো হ্যান্ডলিং। সদ্যসমাপ্ত এ অর্থবছরে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন, যা আগের তুলনায় ৭৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৩ টন বেশি।
সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব, শক্তিশালী অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল আধুনিকায়নের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি এবং অপারেশনাল দক্ষতা অর্জন করেছে। এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত হলে এই প্রবৃদ্ধি আরও অনেক গুণ বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এখন আমাদের বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় শূন্যে চলে এসেছে। এটি আমরা ধারাবাহিকভাবে মেইনটেন করছি। এখন জাহাজের বার্থ অকুফেন্সি শতভাগ।
তিনি আরও বলেন, শুধু আমরা একটু পিছিয়ে আছি কার্গো ডুয়েল টাইমে। যেটি আমরা চাইছি এনবিআর, কাস্টমসের সাথে ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে কমিয়ে আনতে। এনবিআরের সঙ্গে এটি নিয়ে কাজ করছি। ফ্রি অ্যারাইভাল প্রসেসে করতে পারলে কার্গো এবং কন্টেইনার ডুয়েল টাইম কমে যাবে।
এদিকে কার্গো এবং কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের কারণে বেড়েছে বন্দরের রাজস্ব আয়ও। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয় বেড়েছে ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয় ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্ন্দরে শতভাগ ই-গেট পাস কার্যক্রম চালু করা হয়। ফলে চালক বা ব্যবহারকারীরা বন্দরে আসার আগেই দূর থেকে বিকাশ, নগদ, রকেট বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করে পাস সংগ্রহ করতে পারছেন। দ্রুত সময়ে গেট-ইন ও গেট-আউট হওয়ার কারণে বন্দর থেকে কন্টেইনার খালাসে গতি এসেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি বন্দরে যাতায়াত করছে। গেটে শুধু কিউআর কোড এবং বারকোড স্ক্যান করেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গাড়ি বন্দরে প্রবেশ এবং বের হতে পারছে। এছাড়া এখন বন্দরের প্রধান ও জটিল শিপিং কার্যক্রমগুলোকে কাগজের ফাইল থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ফরম্যাটে নিয়ে আসা হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি ও বন্দরব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আধুনিক, স্মার্ট ও পেপারলেস করার লক্ষ্যে চালু হয়েছে নতুন ডিজিটাল প্লাটফর্ম ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো সিপিএ স্কাই’।
বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, বন্দরের সেবাগুলোকে ডিজিটাল ফরম্যাটে নিয়ে আসার কারণে এখন বন্দরের কার্যক্রম আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল হয়েছে। এ কারণে জিরো ওয়েটিং টাইম অর্জন করেছে। আর নিরাপত্তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুদৃঢ় হয়েছে। সম্প্রতি আইপিএস টিমের পাঠানো আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বন্দরের বিরুদ্ধে কোনো পর্যবেক্ষণ (আপত্তি বা নেতিবাচক মন্তব্য) ছিল না এবং এটি বন্দরের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের বহির্নোঙরে অপরাধ শূন্যে নেমে এসেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের বহির্নোঙর এলাকায় সশস্ত্র ডাকাতি ও ছিঁচকে চুরি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময়োপযোগী ও সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে এই এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে প্রশিক্ষিত কর্মীরা জাহাজে সার্বক্ষণিক পাহারায় নিয়োজিত থাকছেন। বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নিরাপত্তা বিভাগ নিয়মিতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সাথে সমন্বিতভাবে নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের মধ্যে সার্বক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে।