× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নাকি নতুন ঝুঁকির সূচনা?

এম এম মুসা

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নাকি নতুন ঝুঁকির সূচনা?

জন মেনার্ড কেইনস ১৯৩৬ সালে 'The General Theory of Employment, Interest and Money'-তে যে যুক্তি দিয়েছিলেন তা আজও প্রাসঙ্গিক- অর্থনীতি যখন মন্দার মুখে, তখন সরকারের সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতিই পুনরুদ্ধারের মূল হাতিয়ার। কিন্তু অর্থনীতিবিদ হাইমান মিনস্কি ১৯৮৬ সালে 'Stabilizing an Unstable Economy'-তে এই কেইনসীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি সতর্কবার্তা দিয়ে সম্পূর্ণ করেছিলেন। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি এমন আর্থিক ভঙ্গুরতা তৈরি করে যা 'মিনস্কি মুহূর্ত' হঠাৎ ঋণ সংকট নিয়ে আসতে পারে।

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঠিক এই দুটি শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে। একদিকে, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সম্প্রসারণমূলক বাজেট, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতে ৩৫.৭৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যাওয়া খেলাপি ঋণ এবং ঋণাত্মক মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (-২.৬৪ শতাংশ) মিনস্কির আর্থিক অস্থিরতার ক্লাসিক লক্ষণ। এই দুই শক্তির টানাটানিতে বাজেটের সত্যিকারের পরীক্ষা শুরু।

কেইনসীয় গুণক এবং বাংলাদেশের রাজস্বনীতির কার্যকারিতা

কেইনসের 'ফিসকাল মাল্টিপ্লায়ার' তত্ত্ব বলে, সরকার যখন এক টাকা ব্যয় করে, তখন অর্থনীতিতে তার চেয়ে বেশি আয় বৃদ্ধি পায়, কারণ সেই ব্যয় অন্যদের আয়ে পরিণত হয় এবং তারা আবার ব্যয় করেন। তবে এই গুণকের মাত্রা নির্ভর করে অর্থনীতির কাঠামোর উপর। উচ্চ আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে, যেখানে চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানি করে মেটানো হয়, সেখানে ব্যয়ের সুফল দেশের বাইরে চলে যায়।

বাংলাদেশ একটি উচ্চ আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি। জ্বালানি, পুঁজিপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে এখানে সরকারি ব্যয়ের কেইনসীয় গুণক তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তবুও, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং প্রবাসী কর্মসংস্থান হ্রাসের (জানুয়ারিতে ৯৫,০০০ থেকে মার্চে ৪৪,০০০-এ নেমে আসা) প্রেক্ষাপটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও ফ্যামিলি কার্ড-এর মতো সরাসরি অর্থ হস্তান্তর কর্মসূচি সামষ্টিক চাহিদা ধরে রাখতে সাহায্য করবে বটে। তবে সেটি কতটা টেকসই হবে সেটি সময় বলে দেবে।

বাজেটে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনসহ মৌলিক পণ্যে এই ছাড় কেইনসীয় 'অ্যাগ্রিগেট ডিমান্ড' রক্ষার একটি প্রচেষ্টা। কারণ দরিদ্র পরিবারগুলোর মার্জিনাল প্রপেনসিটি টু কনজিউম (MPC) বেশি। তারা বাড়তি আয়ের বেশিরভাগই ব্যয় করেন, সঞ্চয় করেন কম। ফলে এই ছাড় অর্থনীতিতে কেইনসীয় গুণকের সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলবে।

মিনস্কির 'আর্থিক অস্থিরতার হাইপোথিসিস' ও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট

মিনস্কির 'Financial Instability Hypothesis' বলে, একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিজেই অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করে। দীর্ঘ স্থিতিশীল সময়ে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতারা উভয়ই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নেন। তিনি তিন ধরনের ঋণগ্রহণের বিষয় চিহ্নিত করেছেন: হেজ ফাইন্যান্স (আয় দিয়ে মূলধন ও সুদ উভয়ই পরিশোধ সম্ভব), স্পেকুলেটিভ ফাইন্যান্স (আয় দিয়ে শুধু সুদ পরিশোধ সম্ভব, মূলধন নয়), এবং 'পঞ্জি ফাইন্যান্স' (নতুন ঋণ ছাড়া পুরনো ঋণের সুদও পরিশোধ সম্ভব নয়)।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা মিনস্কির শ্রেণিবিন্যাসে গভীরভাবে 'পঞ্জি ফাইন্যান্স' ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে। পাঁচটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশের উপরে, এর অর্থ এই ব্যাংকগুলো যে ঋণ বিতরণ করেছে তার মাত্র ১০ শতাংশ আদায়যোগ্য। এই ব্যাংকগুলো 'জম্বি ব্যাংক' হয়ে গেছে, সম্পদহীন কিন্তু দায় বোঝাই। মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ঋণাত্মক হওয়া মানে এই ব্যাংকগুলো প্রযুক্তিগতভাবে দেউলিয়া।

বাজেটে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্মূলধনীকরণে চলতি অর্থবছরে ৪০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে এবং আগামীতে আরও বরাদ্দের ইঙ্গিত রয়েছে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি বেলআউট ব্যাংকিং সংকটকে ঠেকাতে পারে, কিন্তু যদি অন্তর্নিহিত প্রণোদনা-কাঠামো না পাল্টায় তাহলে পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংযোগের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি এখনো পরিবর্তিত হয়নি। ফলে ইতিবাচক ফলাফল প্রাপ্তির সম্ভাবনা নেই বললে চলে।

বেসরকারি বিনিয়োগের সংকোচন

কেইনসীয় সমালোচকরা, বিশেষত মিল্টন ফ্রিডম্যান বলেন, সরকার যখন ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তখন সুদের হার বাড়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হয়। এই 'ক্রাউডিং আউট'-এর প্রভাব বাংলাদেশে এখন সংখ্যায় প্রমাণিত। জুলাই-ফেব্রুয়ারি ২০২৫-২৬ সময়কালে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ৮৮,৩০৯ কোটি টাকা নেট ঋণ নিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেশি।

এর সরাসরি পরিণতি হলো, বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধির হার ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ১৮.৩ শতাংশ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের সর্বনিম্ন। নতুন বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ ৬,০০০ কোটি কমিয়ে ১,১২,০০০ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সামান্য হ্রাস ক্রাউডিং আউটের চাপ কিছুটা কমাবে, কিন্তু আমূল পরিবর্তন আনবে না।

মিনস্কির দৃষ্টিতে আরও গুরুতর সমস্যা হলো, ব্যাংক যখন সরকারি সিকিউরিটি কিনে 'নিরাপদ' আয় পায়, তখন ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু উৎপাদনশীল বেসরকারি উদ্যোগে ঋণ দেওয়ার প্রণোদনা কমে যায়। এতে অর্থনীতিতে মূলধন বরাদ্দের দক্ষতা কমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০,০০০ কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ, যেখানে ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকিসহ বিভিন্ন খাতে ঋণ দেওয়া হবে, এই পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন করতে পারে।

ঋণ স্থায়িত্বশীলতা এবং আইএমএফের শর্তের বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতে বাংলাদেশের ঋণমান 'নিম্ন' থেকে 'মধ্যম' ঝুঁকির বিভাগে উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ অবনতি হয়েছে। ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণ ছিল ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে ৮ লক্ষ ১২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, প্রায় ৬.৫ গুণ বৃদ্ধি। সুদ ব্যয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ৮,৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ১,১৪,৭০০ কোটি টাকা হয়েছে, ১৩ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি।

কেইনসের 'ঋণ পরিচালনা তত্ত্বে' (Debt Management Theory) বলা আছে, যতক্ষণ ঋণের সুদের হার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে কম, ততক্ষণ ঋণ 'স্থায়িত্বশীল' থাকে। বাংলাদেশে এই সমীকরণ এখন বিপজ্জনক: বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪-৫ শতাংশ এবং বাজেট সুদ ব্যয় মোট রাজস্বের একটি বড় অংশ নিয়ে নিচ্ছে। সুদ পরিশোধ ব্যয় শিক্ষা বরাদ্দকেও (আগের বছর পর্যন্ত) ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

IMF-এর ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ আটকে আছে। নতুন সরকার নতুন প্রোগ্রামের জন্য আলোচনা করছে। আইএমএফের শর্তে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সংস্কার ও বিনিময় হারে নমনীয়তার কথা আছে। বাজেটে কর-জিডিপি অনুপাত ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ৯.৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি আইএমএফকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু বর্তমান ৬.৮ শতাংশ থেকে প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি একটি কঠিন লক্ষ্য।

বাজেটের কেইনসীয় শক্তি: চাহিদা ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক দিক

প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু কেইনসীয় শক্তি সত্যিকারের। ফ্যামিলি কার্ডে ৪১ লাখ পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি নগদ হস্তান্তর পরিবারের হাতে অর্থ পৌঁছে দেবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা বাড়াবে। সামাজিক নিরাপত্তায় মোট ১,৪৪,৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ জিডিপির ২.১ শতাংশ, যা 'অ্যাটোমেটিক স্টেবিলাইজার' হিসেবে কাজ করতে পারে। কেইনসের মতে, মন্দার সময় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অর্থনৈতিক পতনকে ঠেকায়।

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে, সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় বাড়াবে এবং মধ্যবিত্তের ভোগব্যয় সক্রিয় করবে। তবে এই ব্যয় বৃদ্ধি যদি সরকারি ব্যাংকের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তা বেসরকারি বিনিয়োগকে চাপে ফেলবে। এর সমাধান ছিল বন্ড মার্কেট উন্নয়ন এবং বিদেশি ঋণের সুষম ব্যবহার, এই বাজেটে উভয় দিকেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যদিও তা পর্যাপ্ত নয়।

উপসংহার: স্থিতিশীলতার পুনর্গঠন বনাম বৃদ্ধির তাড়া

কেইনস ও মিনস্কির সম্মিলিত শিক্ষা হলো, সংকটকালে সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি প্রয়োজন, কিন্তু সেই সম্প্রসারণ যদি দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে অগ্রসর হয়, তাহলে ভঙ্গুরতা আরও বাড়ে। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঠিক এই টানাপোড়েনে বন্ধি।

বাজেট ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি সবাই ৪-৫ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। এই ব্যবধান কেবল আশাবাদ ও বাস্তববাদের মধ্যে নয়, এটি রাজস্ব নীতির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও। যদি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য (৬,০৪,০০০ কোটি টাকা, ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি) পূরণ না হয়, তাহলে ঘাটতি আরও বাড়বে, ব্যাংক থেকে ঋণ আরও বাড়বে এবং আর্থিক অস্থিরতার চক্র আরও শক্তিশালী হবে।

তবু এই বাজেটকে সম্পূর্ণ নিরাশাবাদী দৃষ্টিতে দেখার কারণ নেই। ব্যাংকিং সংস্কারে প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের ঘোষণা এবং বন্ড মার্কেট উন্নয়নের পরিকল্পনা এগুলো মিনস্কির 'আর্থিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে'র দিকে যাত্রা। কেইনস বলতেন, সংকট থেকে মুক্তির পথ কষ্টের, কিন্তু অসম্ভব নয় যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা