গ্রাগিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদি ‘সুকুক’ বা শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ বন্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ ও আয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ২৮ জুন ৯ মাস মেয়াদি এই নতুন বিনিয়োগ উপকরণের নিলাম আহ্বান করেছে। এই নিলামের মাধ্যমে বাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সরাসরি দেশের গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, সুকুক বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অভাবনীয় সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, যা সাম্প্রতিক নিলামগুলোর বিডিং বা দরপ্রস্তাব দেখলেই স্পষ্ট হয়। এটি প্রমাণ করে যে, বাজারে এই ধরনের শরিয়াহসম্মত উপকরণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে সরকারিভাবে ৯১ দিন, ১৮২ দিন এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল চালু থাকলেও ৯ মাস মেয়াদি কোনো বিনিয়োগ উপকরণ ছিল না। ফলে এই নতুন স্বল্পমেয়াদি সুকুক বন্ডটির বাজারে একটি চমৎকার ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ রয়েছে।
বাজারে সুকুক বন্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের এই প্রবল আগ্রহের চিত্র সাম্প্রতিক অন্যান্য নিলামেও দেখা গেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসনের তহবিল জোগাতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি নিলামে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু তার বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৪৪ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার দরপ্রস্তাব জমা দেন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় আটগুণ বেশি। এর আগের মাসেও ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকার একটি সুকুক নিলামে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূল মূল্যের চেয়ে ১২ গুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছিল।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রবর্তনের পর থেকেই দেশে শরিয়াহভিত্তিক এই বিনিয়োগ উপকরণের জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। এ পর্যন্ত সরকার সুকুক ইস্যু করে বাজার থেকে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। আসন্ন স্বল্পমেয়াদি সুকুকের নিলাম সম্পন্ন হওয়ার পর এই সংগ্রহের পরিমাণ ৫৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। নতুন এই ৯ মাস মেয়াদি সুকুক বন্ডে বার্ষিক ৯.৩৬ শতাংশ হারে মুনাফা বা ভাড়া দেওয়া হবে। মেয়াদকর্তিতে এই মুনাফার প্রাক্কলিত পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা, যা মেয়াদ শেষে এককালীন পরিশোধ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে যেকোনো অনাবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই সুকুকে অংশ নিতে পারবে। যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব পরিচালনার মাধ্যমে এই বিনিয়োগ করা যাবে। এছাড়া অন্যান্য সরকারি সিকিউরিটিজের মতোই এই সুকুক বিনিয়োগেও কর রেয়াত সুবিধা বা ট্যাক্স রিবোট পাওয়া যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব পরিচালনাকারী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি এই নিলামে অংশ নিতে পারবে। পাশাপাশি স্থানীয় ও বিদেশি ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ডগুলো অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটেও ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা হ্রাস করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ও গ্রিন বন্ডের পাশাপাশি সুকুকের পরিধি বিস্তৃতির বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য সুকুক ও অবকাঠামো তহবিলের ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুকুকের মাধ্যমে ২৫ হাজার কোটি টাকা তোলার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। বর্তমানে সরকারি বিল ও বন্ডে মোট অনাদায়ী বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং খাতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ২৭ শতাংশ হিস্যা বিবেচনা করলে, সুকুক খাতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগের একটি বিশাল সম্ভাবনা তৈরি রয়েছে। এর আগে সরকার কেবল পাঁচ থেকে সাত বছর মেয়াদি সুকুক ইস্যু করলেও, এই প্রথম স্বল্পমেয়াদি বাজার ধরার উদ্যোগটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে একটি অর্থবহ এবং টেকসই ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।