মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৫২ মিনিট আগে
জুটমিল। ছবি: সংগৃহীত
৬ বছর ধরে বন্ধ ঢাকার ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানী জুটমিল ও করিম জুটমিল। এদিকে শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতির জন্য কাউকে দায়ী করা বা জবাবদিহি করার পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়।
পাটকল করপোরেশনের এবং লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেডের অফিসিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, এই মিলে সুতা তৈরি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বস্তা ও চট বা বোরা বোনার জন্য পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন লাইনের যন্ত্রপাতি রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে তৈরি এই ভারী যন্ত্রপাতিগুলোর প্রধান অংশ হলো এর তাঁত বা লুমÑ যা আছে ৮৪৫টি। মিলের এই বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ বর্তমানে সরকারি সিদ্ধান্তে বন্ধ থাকায় অলস পড়ে রয়েছে, যা প্রায় অকেজো ।
ওদিকে রেকর্ড অনুযায়ী, করিম জুট মিলস লিমিটেডে কাপড় ও বস্তা বোনার প্রধান যন্ত্র হিসেবে সর্বমোট ৫২০টি লুম বা তাঁতকল রয়েছে। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মিলটিতে একটি সম্পূর্ণ কম্পোজিট পাটকলের উৎপাদন লাইনের সব ধরনের যন্ত্রপাতি রয়েছে। লতিফ বাওয়ানীর মতো করিম জুট মিলের যন্ত্রপাতিগুলো ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে বন্ধ থাকায় বর্তমানে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
মিল দুটি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নিম্নমানের ব্যবস্থাপনায় ও বিশেষ কোনো সেফটি ছাড়াই শত শত কোটি টাকার যন্ত্রগুলোর ভেতর ইঁদুর-বিড়ালসহ পশুপাখির বাসস্থান হয়েছে। মিল দুটির কর্মচারী-কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, তারা নিজেদের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন। এ কারণে যন্ত্রপাতিসহ আনুষাঙ্গিক বিষয়ে তাদের তেমন কোনো মনোযোগ নেই।
এসব যন্ত্রপাতির বাজার মূল্য : পাটকল করপোরেশনের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সর্বশেষ অডিট রিপোর্ট এবং বাজার মূল্যায়ন অনুযায়ী, করিম জুট মিলের কারখানার ভেতরে থাকা ৫২০টি লুম, স্পিনিং ফ্রেম, কার্ডিং মেশিন এবং ফিনিশিং সেকশনের সব যন্ত্রাংশ যদি চালু ও কার্যক্ষম অবস্থায় সামগ্রিক ফ্যাক্টরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এর আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। ১৯৫০-এর দশকের মেশিনগুলো ২০২০ সাল থেকে বন্ধ থাকায় অনেকগুলোতে মরচে ধরছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাট ক্রয় কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, এসব যন্ত্রপাতির তেমন কিছুই আর সচল নেই।
জুট মিলস করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সা. সেবা) ও মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মামনুর রশিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যন্ত্রপাতিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। মিল দুটির কত শতাংশ সচল আছে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তবে তিনি জানান, মিলগুলো বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তখন এসব যন্ত্র নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত আসবে। জুট মিলস করপোরেশন উপমহাব্যবস্থাপক (যান্ত্রিক/তড়িৎ), রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম মিল দুটির যন্ত্রপাতির বর্তমান সচল অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল মোক্তাদির চৌধুরী সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানান, উৎপাদনহীন মিলগুলোর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সরকারি বন্ধ পাটকলগুলোর মধ্যে ছয়টি আগামী ছয় মাসের মধ্যে বেসরকারি উদ্যোগে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে মিলগুলোর বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতির পুনঃব্যবহার নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি।
বস্ত্রশিল্প প্রকৌশলী রেহান হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস এবং করিম জুট মিলসÑ উভয় কারখানার বড় অংশই কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। ডেমরা এলাকার বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর কাছাকাছি আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে মিলের ভারী মোটর, মাদারবোর্ড এবং সাব-স্টেশনের কন্ট্রোল প্যানেলগুলোতে মারাত্মক ড্যাম্প (আর্দ্রতা) জমেছে। এগুলো নতুন করে ওয়্যারিং বা পরিবর্তন না করে কোনোভাবেই সচল করা সম্ভব নয়। লতিফ বাওয়ানী ও করিম জুট মিলের বেশিরভাগ লুম অত্যন্ত পুরনোÑ যা ১৯৫৩-১৯৫৪ সালের প্রযুক্তির। এই ভারী কাস্ট আয়রনের কাঠামো বা বডিগুলো টিকে থাকলেও, এগুলোকে সচল করতে প্রতিটি মেশিনের পার্টস আলাদা করে সম্পূর্ণ ওভারহোলিং করতে হবে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক সচিব আবু নাসের খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমার দায়িত্ব পালনকালে পাটকলগুলোর পড়ে থাকা অচল যন্ত্রপাতি সচল করার বিষয়ে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ছাড়া এগুলোর পুনর্ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।