আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৫০ মিনিট আগে
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক। ছবি: মুস্তাচিয়ান পোস্ট
সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিক ও ব্যাংকগুলোর জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫ সালে এই আমানত আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমান জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাংক। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) বৃহস্পতিবার তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে এসেছে। এই বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে আমানত এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। এটি ২০২১ সালের ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাংকের রেকর্ড জমার ঠিক কাছাকাছি রয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনে শুধু বৈধভাবে জমা হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত হিসাবের তথ্য রয়েছে। বহুল আলোচিত অবৈধ বা কালো টাকার কোনো হিসাব এই দাপ্তরিক তথ্যে অন্তর্ভুক্ত নেই।
এবারের আমানত বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এক বছরে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫৭ কোটি ৬৬ লাখসুইস ফ্রাংক। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৮২ কোটি ২৭ লাখ সুইস ফ্রাংক হয়েছে। অর্থাৎ সুইস ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশিদের মোট অর্থের ৯৮.৬ শতাংশই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। এই হার ২০২৪ সালে ছিল ৯৭.৮ শতাংশ। এর আগের বছরগুলোতে এই চিত্র বেশ ভিন্ন ছিল। ২০২৩ সালে এই হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। তার আগে ২০২১ সালে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ শতাংশ।
সুইজারল্যান্ডে অর্থের এই স্থানান্তরকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, এই অর্থ কোনো অবৈধ সম্পদ নয়। এটি ব্যাংকগুলোর নিয়মিত আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অংশ। ব্যাংকগুলো সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের তহবিল জমা রাখে। যেখানে সবচেয়ে ভালো মুনাফা পাওয়া যায়, সেখানেই অর্থ রাখা হয়। মুনাফা এবং বিনিয়োগের সুযোগের ওপর ভিত্তি করে এই তহবিলের অবস্থান পরিবর্তিত হয়। ব্যাংকগুলো এক দেশের এখতিয়ার থেকে অন্য দেশে অর্থ পুনর্বণ্টন করে। এটি একটি চলমান ও সাধারণ প্রক্রিয়া। কোনো নির্দিষ্ট বছরে সুইজারল্যান্ডে বেশি টাকা জমা হওয়া ব্যতিক্রমী কিছু নয়।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়লেও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বা গ্রাহকদের জমার পরিমাণ কমেছে। ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত হিসাবের আমানত প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালে এই খাতে জমা ছিল ১ কোটি ২৬ লাখ সুইস ফ্রাংক। ২০২৫ সালে তা কমে ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাংক হয়েছে। অন্যদিকে সুইস ব্যাংকগুলো এখন গ্রাহকের গোপনীয়তা থেকে সরে এসে স্বচ্ছতার নীতি গ্রহণ করেছে। অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি রোধে তারা বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। ২০১৮ সাল থেকে তারা ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (এইওআই) বা স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় শুরু করেছে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের কর কর্তৃপক্ষ তাদের নাগরিকদের বিদেশি সম্পদের হিসাব যাচাই করতে পারে।
এই ব্যবস্থার আওতায় গ্রাহকের নাম, ঠিকানা, করদাতা নম্বর এবং অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স বিনিময় করা হয়। ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফটিএ) ১০১টি দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করেছে। এর অধীনে প্রায় ৩৪ লাখ আর্থিক অ্যাকাউন্টের তথ্য বিনিময় হয়েছে। ওএইসিডির গ্লোবাল ফোরামের মে ২০২৬-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো এই স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান ইতিমধ্যে এই বৈশ্বিক তথ্য আদান-প্রদান প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সুইস ব্যাংকে আমানত রাখায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। এই অঞ্চলে সবার ওপরে রয়েছে ভারত। ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের জমার পরিমাণ ছিল ৩২০ কোটি সুইস ফ্রাংক। তবে ভারতের মোট আমানত আগের বছরের চেয়ে ৮ শতাংশ কমেছে। ভারতের কমলেও বাংলাদেশের আমানত ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শতাংশের দিক থেকে আফগানিস্তানে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দেশটিতে আমানত বেড়েছে ৪৮.২ শতাংশ। তবে অংকের হিসাবে তাদের মোট জমা মাত্র ৪৭ লাখ সুইস ফ্রাংক। সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। অঞ্চলের চারটি দেশ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়েছে। দেশগুলো হলো ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও ভুটান। অন্যদিকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপে আমানত বেড়েছে।