বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের লোগো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের তীব্র তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গ্রাহকদের স্বাভাবিক লেনদেন সচল রাখতে ও চলমান আর্থিক চাপ সামাল দিতে সর্বশেষ ব্যাংটিকে আরও ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে গত তিন দিনে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ জালিয়াতি, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের আস্থা সংকটের জেরে ব্যাংকটি বড় ধরনের তারল্য ঘাটতিতে পড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন ও দৈনন্দিন ব্যাংকিং সেবার ওপর।
এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই গত মঙ্গলবার ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠক করেছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। বৈঠক শেষে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাতটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়।
তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অতীতে যেসব গোষ্ঠী ব্যাংকটির মালিকানা বা শেয়ার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল, তা হয় আগের প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক, অন্যথায় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হোক। ফোরামের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনরায় পদে বহাল করার ব্যাপারে নতুন পরিচালনা পর্ষদ প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের আশ্বস্ত করেছে। এর পাশাপাশি, ব্যাংকের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি একটি নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ পর্ষদ গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।
২০১৭ সালে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পর থেকেই ব্যাংকটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। পরবর্তী সময়ে এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তার, বিপুল অঙ্কের অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্ষদ পুনর্গঠন করলেও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, গ্রাহকদের বড় অঙ্কের আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে নানা টানাপড়েনের কারণে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকটিতে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছিল। এই পরিস্থিতিতে গত রোববার ‘ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থে’ বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তের বাইরে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি না হলেও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, পর্ষদ বাতিলের ফলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। অন্যদিকে, ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণের আবেদন করা ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন আশা প্রকাশ করে বলেছেন, বিশেষ ধারের বড় অংশই তাদের ব্যবহার করতে হবে না, কারণ গ্রাহকদের টাকা তোলার প্রবণতা ইতিমধ্যেই অনেক কমে এসেছে এবং ব্যাংকটি দ্রুতই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।