× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আয়করের নয়া প্রস্তাবে চাপে পড়বেন চাকরিজীবীরা

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬ ১৪:৫০ পিএম

আগামী ২০২৬-২৭ করবর্ষে মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য প্রকৃত করের বোঝা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আগামী ২০২৬-২৭ করবর্ষে মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য প্রকৃত করের বোঝা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আগামী ২০২৬-২৭ করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা কিছুটা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও, মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য প্রকৃত করের বোঝা উল্টো আরও বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে।

সরকারের নতুন বাজেট ও অর্থ বিলে করের স্তর এবং রেয়াত সংক্রান্ত নীতিমালায় বড় ধরনের যে তিনটি পরিবর্তন আনা হয়েছে, তার ফলেই মূলত মধ্যম আয়ের চাকরিজীবী ও সাধারণ করদাতারা এই বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিকভাবে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধিকে এক ধরনের স্বস্তি মনে হলেও অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে করদাতাদের পকেট থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চলে যাবে।

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেন। তবে করদাতাদের এই প্রাথমিক স্বস্তি স্থিমিত হয়ে পড়েছে অর্থ বিল-২০২৬-এর অন্যান্য প্রস্তাবনার কারণে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আনা হয়েছে সর্বনিম্ন করের স্তরে।

এতদিন করমুক্ত সীমার পরবর্তী আয়ের ওপর সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ হারে কর দেওয়ার বিধান ছিল। নতুন প্রস্তাবে এই ৫ শতাংশের প্রাথমিক স্তরটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে সরাসরি ১০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। ফলে করমুক্ত আয়ের পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর এখন থেকে দ্বিগুণ হারে কর দিতে হবে, যা প্রান্তিক ও নিম্ন স্তরের করদাতাদের করের দায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়ে দেবে। বর্তমান নিয়মে যেখানে করমুক্ত সীমার ওপর প্রথম ১ লাখ টাকার জন্য মাত্র ৫ শতাংশ কর দিতে হতো, নতুন কাঠামোতে তা এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

হিসাব কষে দেখা গেছে, এই স্তর পরিবর্তনের প্রভাব মাঝারি আয়ের মানুষের ওপর কতটা তীব্র হবে। এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, করের স্তর পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগজনিত রেয়াতের সুবিধা কমে যাওয়ার কারণে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে একজন করদাতার মাসিক মোট আয় ৭৪ হাজার টাকা হলে তার করের দায় প্রায় ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত পাঁচ বছর মেয়াদি ভবিষ্যৎমুখী কর কাঠামোতে এই পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই কাঠামোর কারণে যারা মাসে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন, তাদের কর বাবদ অর্থ পরিশোধের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। অথচ এর বিপরীতে যাদের মাসিক আয় আড়াই লাখ টাকার বেশি, তাদের সামগ্রিক করের দায় বৃদ্ধি পাবে মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এর ফলে উচ্চ আয়ের তুলনায় মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর করের আপেক্ষিক চাপ অনেক বেশি অসঙ্গতিপূর্ণ রূপ নিচ্ছে।

করের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি মধ্যবিত্তের ওপর দ্বিতীয় বড় আঘাতটি এসেছে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বা ছাড়ের ক্ষেত্রে। এতদিন করদাতারা সরকার অনুমোদিত সঞ্চয়পত্র বা নির্দিষ্ট আর্থিক খাতে বিনিয়োগ করে মোট যোগ্য বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ হারে কর রেয়াত পেতেন। নতুন বিলে এই রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বছরে সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

এর ফলে যারা বৈধ বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের করের পরিমাণ কমিয়ে রাখতেন, তারা এখন থেকে অনেক কম সুবিধা পাবেন। এই নীতিমালার সুবিধা ধরে রাখতে হলে করদাতাদের আগামী ৩০ জুন ২০২৬-এর আগেই যোগ্য খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে, অন্যথায় তাদের প্রকৃত করের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া এই বিষয়ে বলেন, প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপগুলোর ফলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু বেতনভোগী কর্মচারীদের প্রকৃত করের বোঝা সরাসরি বৃদ্ধি পাবে।

অর্থ বিলে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎসাহিত করার নামে একটি নতুন এবং কঠোর শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিনিয়োগের বিপরীতে কর সুবিধা পেতে হলে সেই বিনিয়োগকে মেয়াদ ফুরানো বা ম্যাচিউরিটি পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে। যদি কোনো করদাতা মেয়াদের আগেই টাকা তুলে নেন বা বিনিয়োগ নগদায়ন করেন, তবে তিনি আগে যে কর রেয়াত ভোগ করেছিলেন, তা যে বছরে টাকা তুলছেন সেই বছরের অতিরিক্ত কর হিসেবে ফেরত দিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপÑ কেউ যদি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে ফেলেন, তবে তাকে আগে নেওয়া কর রেয়াতের সমপরিমাণ টাকা পুনরায় কর হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। তবে কর সুবিধার জন্য ডিপোজিট পেনশন স্কিমে (ডিপিএস) বার্ষিক বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা আগের মতোই ১ লাখ ২০ হাজার টাকা রাখা হয়েছে এবং সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রেয়াতের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ টাকা।

আইনের এই কঠোর অবস্থানের মধ্যে অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমবারের মতো দ্রুত কর রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব করেছে। কোনো করদাতা যদি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের রিটার্ন দাখিল করেন, তবে তারা প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ২৫ হাজার টাকাÑ এই দুটির মধ্যে যা কম, সেই পরিমাণ অর্থ সরাসরি রেয়াত বা ছাড় হিসেবে পাবেন। সংসদ কর্তৃক এই অর্থ বিল অনুমোদিত হলে আগামী ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকেই সব পরিবর্তন কার্যকর হবে।

এই সামগ্রিক কর নীতিমালার প্রভাব বিশ্লেষণ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বার্ষিক ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কারী করদাতারা ছাড়া বাকি প্রায় সব শ্রেণির নাগরিকই নতুন ব্যবস্থার কারণে বাড়তি করের মুখোমুখি হবেন। আয় বৃদ্ধির সব স্তরেই এই করের প্রভাব অনুভূত হলেও মধ্যবিত্তের ওপর এর তীব্রতা হবে সবচেয়ে বেশি। উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি কর দিলেও শতকরা হিসেবে মধ্যবিত্তের করের দায় বৃদ্ধির হার অনেক বড়।

ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়ে এই গবেষক আরও উল্লেখ করেন, এই নীতিমালার ফলে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় মূল্যস্ফীতির যে চাপ রয়েছে, তা প্রশমনের সরকারি উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। কারণ এর ফলে মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত হবে। সাধারণত এই শ্রেণির মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত আয় কম থাকে এবং তাদের সঞ্চয়ও সীমিত। ফলে করের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের ভোগ বা খরচ করার ক্ষমতা কমে যাবে, যা পরোক্ষভাবে দেশীয় উৎপাদিত পণ্য ও সেবার চাহিদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তৌফিকুল ইসলাম খানের মতে, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো করছাড়ের পরিমাণ কমিয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো। এই নীতি মূলত উৎপাদনশীল ও শিল্প খাতের বিনিয়োগের সুবিধাগুলো বজায় রেখে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বিনিয়োগজনিত রেয়াত বা ছাড়ের পরিধি কমিয়ে আনার জন্য তৈরি করা হয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) করছাড় কমানোর কিছু সুপারিশ থেকে সরে এলেও, এই নির্দিষ্ট পদক্ষেপটি করদাতাদের, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত সমাজকে এক চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা