ফাইল ছবি
দেশের সাধারণ করদাতাদের জন্য কর প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং আস্থাশীল করতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন অর্থবিল ২০২৬ এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো করদাতাদের পরিশোধিত অতিরিক্ত করের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দেওয়ার বিধান যুক্ত হতে যাচ্ছে।
নতুন এই আইন অনুযায়ী, করদাতারা তাদের প্রকৃত বকেয়া করের চেয়ে বেশি টাকা পরিশোধ করে থাকলে, সেই উদ্বৃত্ত অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চলে যাবে। আয়কর রিটার্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে এই অর্থ ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনকে আরও বেশি করদাতাবান্ধব করার লক্ষ্যেই এই যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নতুন এই নিয়মটি প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু খাতের ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। বিশেষ করে চাকরিজীবী বা বেতনভোগী শ্রেণি, সাধারণ কৃষিজীবী এবং যারা বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ থেকে আয় করেন, তারা এই স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড সুবিধা পাবেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, করদাতারা অনলাইন কর রিটার্ন পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করার পর সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এই রিফান্ড জেনারেট বা তৈরি হবে। তবে এই অর্থ ফেরত পাওয়ার আগে করদাতার দাখিলকৃত রিটার্ন যাচাই-বাছাই বা প্রসেসিংয়ের কাজ সম্পন্ন হতে হবে। আইন অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর-কে অবশ্যই ১২০ দিনের মধ্যে রিটার্ন প্রসেসিংয়ের এই কাজ চূড়ান্ত করতে হবে।
কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা
এই আইন বাস্তবায়নে কর কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর দায়বদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। অর্থবিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে করদাতার অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করতে ব্যর্থ হলে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটিকে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাফিলতি বা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমান অর্থবছর থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সাধারণ ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সবাইকে এখন অনলাইনেই রিটার্ন দিতে হচ্ছে। ফলে স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ব্যবস্থা চালু হলে অনলাইন রিটার্ন জমা দেওয়ার হার এবং করদাতাদের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজস্ব প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, উন্নত দেশগুলোতে কর ফেরত বা রিফান্ড দেওয়ার এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সাধারণ একটি বিষয়। এটি করদাতা এবং কর কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আগামী অর্থবছর থেকেই এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো করদাতাদের আশ্বস্ত করা যে, সরকারের তহবিলে তাদের কষ্টার্জিত অতিরিক্ত টাকা আটকে থাকবে না এবং তাদের বাড়তি করের বোঝা বইতে হবে না। এই উদ্যোগের ফলে দেশের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের কাঠামোতে করদাতাদের আস্থা অনেক শক্তিশালী হবে এবং কর দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে।
এই ঐতিহাসিক আইনি পরিবর্তনকে দেশের অর্থনীতি এবং কর বিশেষজ্ঞরা স্বাগত জানিয়েছেন। কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, এটি দেশের কর ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক সংস্কার। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কর প্রশাসন ও করদাতার মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।