আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি ও রপ্তানি শুল্কে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের শিল্প খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং জনজীবনের মানোন্নয়নে আমদানি ও রপ্তানি শুল্কে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই শুল্ক নীতিমালায় স্থানীয় শিল্পের বিকাশ এবং পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রিন ইকোনমি বা সবুজ অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক যান (ইভি) ও সৌর বিদ্যুৎ খাতে ঐতিহাসিক শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে, যার বিপরীতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ি ও তামাকজাত পণ্য আমদানিকে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাজেটে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি বাড়াতে কাস্টমস আইনে নতুন অধ্যায় যুক্ত করে ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ বা ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে এই অঞ্চলে রপ্তানির উদ্দেশ্যে শুল্কহীনভাবে পণ্য আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিংয়ের সুযোগ পাবেন উদ্যোক্তারা।
পাশাপাশি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে অফশোর আইটি ও আইসিটি সেবায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। এতদিন এই খাতে বিদেশি মালিকানাধীন শেয়ারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ রাখার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা সম্পূর্ণ বিলোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো শতভাগ মালিকানা নিয়ে এ দেশে আইটি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে।
বাজেটে দেশের লজিস্টিকস খাতের আধুনিকায়নে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেসরকারি এয়ারকার্গো অপারেটর স্টেশন স্থাপনের জন্য নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিমানবন্দরগুলো পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিকস হাবে উন্নীত হবে এবং ই-কমার্স খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। পাশাপাশি গ্রিনফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট বা নতুন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ টানতে বেসরকারি বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটর সংক্রান্ত বৈশ্বিক মানের বিধিমালা তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে দেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশে আগামী ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর শূন্য শতাংশ করে প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষার জন্য মাউন্টিং মার্ক, লিথিয়াম সেল ও ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের মতো পণ্যের রেয়াতি সুবিধা ২০২৮ সালের পর প্রত্যাহার করা হবে। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন ও আমদানিতে যুগান্তকারী শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান চার চাকা ও তিন চাকার ইভি সংযোজন এবং উচ্চ মূল্য সংযোজন করবে, তাদের ক্ষেত্রে মাত্র ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক রেখে বাকি সব শুল্ক-কর মওকুফ করা হয়েছে। কম মূল্য সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য এই শুল্ক হবে ১৫ শতাংশ। এছাড়া স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনের কাঁচামালে মাত্র ৫ শতাংশ ভ্যাট রেখে সব শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে, যা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
সাধারণ আমদানিকৃত ইভি গাড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৯৩ শতাংশ শুল্ক-কর কমিয়ে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির সামগ্রিক শুল্ক-করও উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
ইভির ব্যবহার নির্বিঘ্ন করতে চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের আমদানি শুল্ক প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর বিপরীতে পরিবেশ রক্ষায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসির জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত সনাতন গাড়ির সামগ্রিক কর ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাসের আমদানিতেও শুল্ক-কর মওকুফ করা হয়েছে, যা আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতের প্রসারে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সফটওয়্যার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সলিড স্টেট ড্রাইভ বা এসএসডি আমদানিতে মাত্র ৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রেখে বাকি সব কর তুলে নেওয়া হয়েছে।
ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে পয়েন্ট অব সেলস (পস) মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর পুরোপুরি বিলোপ করা হচ্ছে। দেশে সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ ডিজাইন শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে ২০৩১ সাল পর্যন্ত মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক সাপেক্ষে বাকি সব শুল্ক-কর মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো স্মার্ট কার্ডের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে ১০টি জরুরি কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত সব শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স যেমন- মোবাইল, ফ্রিজ, এসি ও ওয়াশিং মেশিন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সুবিধা বজায় রাখা হয়েছে জাহাজ ও ড্রেজার নির্মাণ শিল্পেও।
আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের বাজারে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমাতে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় ব্যবহৃত সব ধরনের মসলা এবং খেজুর আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে বড় সুখবর নিয়ে এসেছে এই বাজেট প্রস্তাবনা। দেশের বিপুল সংখ্যক কিডনি রোগীর জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য চিকিৎসা সামগ্রী ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর থেকে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর ফলে প্রতিবার ডায়ালাইসিসের খরচ প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে, যা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী দেশীয় শিল্পের কাঁচামালে ক্যাটাগরি ভেদে ৫ ও ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করে এই সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বজায় রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া মৃতদেহ সংরক্ষণের মর্গ আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশীয় ওষুধ শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে এবং ক্যানসারের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সুলভ করতে নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) তৈরিতে ৫১টি নতুন কাঁচামাল এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কৃষি খাতের সুরক্ষায় বাজেটে দেশীয় কীটনাশক শিল্পের জন্য ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট পুরোপুরি মওকুফ করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জিংক সালফেট সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে এর মূল উপাদান জিংক অ্যাশ বা দস্তা ছাই আমদানির শুল্ক শূন্য করা হয়েছে।
এছাড়া সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পরিবর্তে জেনেরিক ক্যাটাগরির ভেটেরিনারি মেডিসিন আমদানিতে শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে দেশীয় চাষীদের সুরক্ষায় প্রক্রিয়াজাত ও অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং দেশীয় মৎস্য শিল্পের সুরক্ষায় পাঙ্গাস মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্যের জন্য তিনটি নতুন কাঁচামাল এবং এই খাতের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ২১ ধরনের বিশেষ সহায়ক সরঞ্জাম (অ্যাসিসটিভ ডিভাইস) আমদানিতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা বৃদ্ধি করবে এবং পরিবারের ওপর করের বোঝা লাঘব করবে।
অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর নিকোটিন গ্রানিউলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানিতে নতুন কোড সৃষ্টি করে ৩৫০ শতাংশ উচ্চ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) আমদানির শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই আমদানি-রপ্তানি শুল্ক প্রস্তাবনা দেশের উৎপাদনশীল খাতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে।